শরিফুল ইসলাম
ঝিনাইদহ জেলার ঐতিহাসিক জনপদ বারবাজারে অবস্থিত প্রাচীন ‘ঘোড়ার মসজিদ’ (স্থানীয়ভাবে ‘ঘোড়ার মসজিদ’ নামেও পরিচিত) আজও মধ্যযুগীয় ইসলামী স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এর স্থাপত্যশৈলী, নির্মাণকৌশল ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব গবেষক ও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে চলেছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ঐতিহাসিকদের মতে, মসজিদটি ১৫শ শতাব্দীতে বাংলার সুলতানি আমলে নির্মিত হয়। ধারণা করা হয়, এটি খান জাহান আলী (রহ.)-এর সমসাময়িক কোনো শাসক বা ধর্মপ্রচারকের উদ্যোগে নির্মিত। সে সময় বারবাজার ছিল একটি সমৃদ্ধ জনপদ ও বাণিজ্যকেন্দ্র। ধর্মীয় ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
‘ঘোরার মসজিদ’ নামকরণের পেছনে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। কেউ বলেন, মসজিদের দেয়ালে বা অলংকরণে ঘোড়ার প্রতীক ব্যবহারের কারণে এ নামকরণ; আবার কারও মতে, আশপাশে একসময় ঘোড়ার হাট বসত, সেখান থেকেই নামের উৎপত্তি।
স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য
মসজিদটি মূলত পোড়ামাটির ইট দ্বারা নির্মিত। এর দেয়াল অত্যন্ত পুরু এবং গম্বুজাকৃতি ছাদ ছিল বলে ধারণা করা হয়, যদিও সময়ের ব্যবধানে কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মসজিদের ভেতরে একাধিক মিহরাব রয়েছে, যা সুলতানি স্থাপত্যরীতির বৈশিষ্ট্য বহন করে। দেয়ালের কারুকাজে সরল কিন্তু নান্দনিক নকশার ছাপ দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মসজিদের নির্মাণশৈলী বাংলার প্রাচীন মসজিদ স্থাপত্যের ধারাবাহিকতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এটি প্রমাণ করে যে, সে সময় অঞ্চলে ইসলামী সংস্কৃতি ও স্থাপত্যচর্চা যথেষ্ট বিকশিত ছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব
বারবাজার অঞ্চলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আশপাশে আরও বেশ কয়েকটি প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ রয়েছে, যা থেকে ধারণা করা যায়, এখানে একসময় একটি সমৃদ্ধ নগর গড়ে উঠেছিল। ঘোরার মসজিদ সেই প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম নিদর্শন।
স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটির সংরক্ষণে উদ্যোগ নিয়েছে। তবে পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রচারের অভাবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখনও অনেকের অজানা রয়ে গেছে।
পর্যটন সম্ভাবনা
ইতিহাসপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বারবাজারের ঘোরার মসজিদ হতে পারে একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। যথাযথ সংরক্ষণ, তথ্যফলক স্থাপন ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা গেলে এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সব মিলিয়ে, শত বছরের ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা বারবাজারের ঘোরার মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক মূল্যবান দলিল। যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এর প্রকৃত গুরুত্ব আরও উন্মোচিত হবে-এমন প্রত্যাশা সবার।

