কাজী নূর
‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবৈশাখীর ঝড় / তোরা সব জয়ধ্বনি কর… / ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নূতন সৃজন বেদন / আসছে নবীন জীবন ধারা অসুন্দরে করতে ছেদন…’
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই অমোঘ আহ্বানেই যেন জেগে উঠছে বাঙালির প্রাণ। সংক্রান্তির হালখাতায় পুরোনো সব জরাজীর্ণতা আর দায়-দেনা চুকিয়ে বাঙালির জীবনে নতুন প্রাণ সঞ্চারের বার্তা নিয়ে আর মাত্র কয়েক দিন পরেই আসছে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩।
অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই উৎসবকে বরণ করে নিতে এখন দেশজুড়ে সাজ সাজ রব। আর এই উৎসবের আমেজ যেখানে সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়, সেই মঙ্গল শোভাযাত্রার সূতিকাগার, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জেলা যশোর এখন প্রস্তুতিতে উত্তাল।
যশোরের প্রধান প্রধান সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো তাদের বর্ণাঢ্য এবং পৃথক সব কর্মসূচি চূড়ান্ত করেছে। বিবর্তন যশোর, সুরবিতান সঙ্গীত একাডেমি এবং সুরধুনী সংগীত নিকেতনের মতো প্রথিতযশা সংগঠনগুলোর কার্যালয়ে এখন দিনরাত চলছে মহড়া আর সাজসজ্জার কাজ।
যশোরের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক সংগঠন বিবর্তন যশোর এবার তাদের বৈশাখী আয়োজনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘শান্তিময় পৃথিবী চাই’। সংগঠনের সভাপতি নওরোজ আলম খান চপল জানান, দুই দিনব্যাপি এই বর্ণিল আয়োজনে থাকছে নাটক, গান, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্য।
পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে শোভাযাত্রা শেষে বিবর্তন কার্যালয়ে থাকবে প্রথাগত মিষ্টিমুখ। এরপর শিশুদের পরিবেশনায় দিনভর চলবে আবৃত্তি, সঙ্গীত, নৃত্য ও নাটক। বৈশাখের ৪ তারিখ বিকেলে শহরের নবকিশলয় স্কুল প্রাঙ্গণে বড়দের পরিবেশনায় থাকছে জমজমাট আয়োজন। এদিন বিকেল ৫টায় মুনশি মেহেরুল্লাহ ময়দানের রওশন আলী মঞ্চে বিবর্তন পরিচালিত ‘আনন্দ বাড়ি’র শিল্পীরা পরিবেশন করবেন আবৃত্তি, সঙ্গীত, নৃত্য ও নাটক। শিশুদের জন্য নাটক ‘নাককাটা রাজা’ ও ‘মামা ভাগ্নে’ এবং বড়দের জন্য রয়েছে নাটক ‘গুপ্তবিদ্যা’। এছাড়া কোরাস, ডুয়েট গান ও গিটার বাদন তো থাকছেই।

ঐতিহ্যবাহী সুরবিতান সঙ্গীত একাডেমি এবার ভিন্নধর্মী এক আয়োজন নিয়ে হাজির হচ্ছে। তাদের এবারের প্রতিপাদ্য ‘সুন্দর হও’। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট বাসুদেব বিশ্বাস জানান, এবারের মূল আকর্ষণ হিসেবে থাকছে একসাথে ৩৩টি গানের বিশেষ পরিবেশনা।
এছাড়াও লোকজ গান, কবিগান, নৃত্য, হাওয়াইন গিটার বাজানো এবং কবিতা আবৃত্তিতে মুখর থাকবে রওশন আলী মঞ্চ। বৈশাখের প্রথম দিনে সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে সুরবিতান ভবনে মিষ্টিমুখের মাধ্যমে শুরু হবে তাদের আনুষ্ঠানিকতা।
‘বাঙালি সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরো’ এই স্লোগানকে ধারণ করে বৈশাখী কর্মসূচি সাজিয়েছে সুরধুনী সংগীত নিকেতন। সংগঠনের সভাপতি হারুন অর রশীদ জানান, তাদের আয়োজনে থাকছে ১৬টি ডুয়েট গান, ২টি কোরাসসহ মোট ২৬টি গান। পাশাপাশি থাকছে তবলা লহড়া, একক ও দলীয় আবৃত্তি এবং নজরকাড়া নৃত্য।

ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক কর্মসূচির পাশাপাশি এবার বৈশাখের আনন্দে ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে সুরধুনী সংগীত নিকেতন ও বিবর্তন যশোরের যৌথ আয়োজন। হারুন অর রশীদ জানান, দুই সংগঠনের শিল্পীদের সমন্বয়ে বেশকিছু বিশেষ পরিবেশনা এবার দর্শকদের জন্য চমক হিসেবে থাকবে।
যশোরের এই সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞ প্রমাণ করে যে, উগ্রবাদ আর অসুন্দরের বিরুদ্ধে বাঙালি সংস্কৃতির এই ঢাল আজও কতটা মজবুত। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের এই নব প্রভাত যশোরের আকাশ-বাতাসকে রাঙিয়ে দিক নতুন আভায় এটাই এখন শহরবাসীর কামনা।

