চৌগাছা সংবাদদাতা 

দু’ পক্ষের মামলার কারণেদেশ স্বাধীনের ৫৬ বছরেও যশোরের চৌগাছার পাশাপোল ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব ভবন নির্মাণ হয়নি। এতে করে ইউনিয়ন পরিষদের দেয়া নানা সেবা গ্রহণের ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কখনও কখনও হচ্ছেন বঞ্চিতও। এ অবস্থায় সকল ভেদাভেদ ভুলে নির্ধারিত স্থানে পরিষদের নামে রেজিস্টিকৃত জমিতেই পরিষদের নতুন ভবন নির্মাণের দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি সকল ভেদাভেদ ভুলে ইউনিয়নবাসীর উন্নয়নের স্বার্থে সকলকে একতাবদ্ধ হতে হবে পরিষদের ভবন নির্মাণে।

জানা গেছে, স্থাপনের পর থেকেই স্থানীয় জনগনের আর্থিক সহযোগিতায় নির্মিত ভাঙ্গাচোরা পুরাতন একটি টিন শেডের ঘরে চলছে পাশাপোল ইউনিয়ন পরিষদের সকল কার্যক্রম। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুসারে এ ইউনিয়নের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১১টি, দাখিল মাদ্রাসা ১টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৩টি ও কলেজ ১টি ও হাফেজিয়া মাদ্রাসার সংখ্যা ৭টি। এ ইউনিয়নের ১৭ টি গ্রামে হিন্দু-মুসলিম মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। যার মধ্যে ভোটার সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজারের মত। মসজিদের সংখ্যা ৪৩টি ও মন্দির রয়েছে ৬টি। এছাড়া গ্রাম্য হাট ৫টি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র ৩টি, পরিবার পরিকল্পনা অফিস রয়েছে ১টি।

সরেজমিনে দেখা যায়, ইউনিয়নের পাশাপোল গ্রামে একটি গরুর খামারের মত টিন শেডের ঘরে চলছে ইউনিয়ন পরিষদের যাবতীয় কার্যক্রম। তথ্য সেবা সরকারের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। জন্ম নিবন্ধন, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা,পঙ্গু ভাতা  সহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ এ তথ্য অফিসে করতে হয়। ভাঙাচুরা ভবনের বেহালদশায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন সেবাগ্রহীতারা। এ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মাওলানা আবু সাঈদ বলেন, পাশাপোল ইউনিয়নে হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলেমিসে বসবাস করে। রোজা-পূজা একই সময় হলেও নেই কোন সম্প্রদায়িক সংঘাত। এক সময়ের অবহেলিত ইউনিয়ন রাস্তা-ঘাট ভালো ছিলো না। ফলে চলাচলে ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বর্তমানে রাস্তা ঘাট চলাচলের কিছুটা উপযোগী হয়েছে। বর্তমানে ব্যবসা, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ সব দিকদিয়ে উপজেলার অন্য যে কোনো ইউনিয়নের চেয়ে পাশাপোল বেশ এগিয়ে। তবে ইউনিয়ন পরিষদের ভবন না থাকায় নাগরিকরা সেবা নিতে ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হয়ে থাকেন। এ ইউনিয়নের দুই বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান অবাইদুল ইসলাম সবুজ বলেন, পাশাপোল ইউনিয়নটি মূলত পূর্ব-পশ্চিম দিকে লম্বা। পূর্ব পাশে হাউলি, দুড়িয়ালী, মালিগাতি, সুরেশ্বরকাটি, রানীয়ালী কালিয়াকুন্ডি, বিলএড়োল, বড় গোবিন্দপুর, গোপীনাথপুর গ্রামের অবস্থান। এ গ্রামগুলো তুলনামুলক নিচু এলাকাতে অবস্থিত। এখানে সব থেকে বেশি হিন্দু সম্প্রদায় লোকজনের বসবাস। পশ্চিমপাশে পাশাপোল, বুড়িন্দিয়া, দশপাখিয়া, রঘুনাথপুর, পলুয়া, খলশী, মাছরাঙ্গা, বানুরহুদা, কালকেপুরসহ বেশ কিছু গ্রাম রয়েছে। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে পাশাপোল ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়। সে সময় পাশাপোল গ্রামের প্রয়াত খাইরুজ্জামান এ পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নির্বাচনের পর কোনো ভবন না থাকায় নিজ বাড়ির বৈঠক খানায় চালাতেন পরিষদের কার্যক্রম। পরে পলুয়া গ্রামের আব্দুস শুকুর, পাশাপোল হতে মাওলানা আবু সাঈদ, মাওলানা আব্দুল কাদের, ইমামুল হাসান টুটুল, শাহিন রহমান শাহিন, আবুল কাশেম সর্বশেষ অবাইদুল ইসলাম সবুজ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নির্বাচিত চেয়ারম্যানগণ তার এলাকায় বাজারে বা বাড়িতে অফিস করে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। এতে করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আসবাবপত্র চেয়ারম্যানের বসবাসের ঘরে রাখা হয়। ইউনিয়ন সচিব বাজার ঘাটে টি স্টলে বসে জনগনের দরকারি কাজ সেরে  দিতে বাধ্য হন। ভোট দিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা সত্ত্বেও তাদের ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হতে হয়। ভিজিডি কার্ড, টিসিবির মালামাল, টি আর কাবিখা, রিলিফের মালামাল রাখার জন্য কোন সময় স্কুল, কোন সময় ভাড়া করা ঘর, কোন সময় কারোর বৈঠক ঘরে রাখতে হয়। এসব বিষয়ে স্থানীয়রা বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের ভবনটি কোথায় হবে হাউলি, দুড়িয়ালী না পাশাপোল, দশপাখিয়া এই নিয়ে ৪৫ বছর যাবৎ চলছে রশি টানাটানি। একপর্যায়ে ১৯৯২ সালে আদালতে এ নিয়ে করা হয় একটি মামলা। নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত পাশাপোলের পক্ষে মামলার রায় থাকলেও প্রতিপক্ষের বাঁধার মুখে ভবন নির্মাণ হয়নি। বর্তমানে মামলাটি সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন। মামলার কারণে সরকারিভাবে বরাদ্দ দেয়া ইউনিয়ন পরিষদের আধুনিক ভবন নির্মিত হয়নি।

ইউনিয়নের মৎস্যরাঙ্গা গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা বিল্লাল হোসেন বলেন, আমরা আধুনিক যুগে বসবাস করেও সেই আদিম যুগের মত কার্যক্রম পরিচালনা করি, যা মেনে নেয়ার মত নয়। সব হানা-হানি পিছনে ফেলে ইউনিয়নবাসীর সুবিধামত পাশাপোল দশপাখিয়া বাজার সংলগ্ন স্থানে ইউনিয়ন পরিষদের ভবন নির্মাণ করার আহবান জানান তিনি। বর্তমান যেখানে জনগণের অর্থায়নে নির্মিত ভবন তার পাশে বাজার  দশপাখিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিরাপত্তার জন্য স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি, মসজিদ, ডাকঘর বিভিন্ন এনজিও অফিস আছে। বর্তমান নতুন সরকার এ ইউনিয়ন পরিষদের দিকে সুদৃষ্টি দেবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করছি। এ সময় উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ও পাশাপোল ইউনিয়নের বুড়িন্দিয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজেদ আলী, দশপাকিয়া গ্রামের প্রভাষক মামুদুর রহমান, পলুয়া গ্রামের জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আলমগীর হোসেন বলেন, বর্তমানে এ ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম যে স্থানে চলছে সেখানে ২০০৩ সালে ৬৫ শতক জমি পরিষদের নামে রেজিস্ট্রি করে দেয়া হয়েছে। এ জায়গাটি ইউনিয়নের মাঝখানে। সব কিছু ভুলে এই জায়গায় যদি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয় সে ক্ষেত্রে ইউনিয়নের নাগরিকরা ভালোভাবে সেবা পাবেন। সে জন্য নতুন সরকারের কাছে দশপাখিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশেই পরিষদের ভবন নির্মাণের আবেদন তাদের।

এ ব্যাপারে চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইসলাম বলেন, মামলার কারণে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনটি নির্মাণে জটিলতা রয়েছে। জটিলতা কেটে গেলেই ভবনটি নির্মাণে ব্যবস্থা হবে বলে আমি আশাবাদী।

Share.
Exit mobile version