বাংলার ভোর প্রতিবেদক
যশোরের চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও হত্যাসহ ২৩ মামলার আসামি ভাইপো রাকিবকে আটক করেছে ডিবি পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে ডিবির ওসি মঞ্জুরুল হক ভুঞার নেতৃত্বে একটি টিম বেজপাড়া এলাকা থেকে তাকে আটক করে। কাজী রাকিব ওরফে ভাইপো রাকিব শংকরপুর এলাকার তৌহিদুল ইসলামের ছেলে।
যশোর ডিবির অফিসার ইনচার্জ মঞ্জুরুল হক ভুঁইয়া জানান, ভাইপো রাকিব যশোরের চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে চারটি হত্যা, সাতটি অস্ত্র, চারটি বিস্ফোরক, চাঁদাবাজিসহ ২৩ টি মামলা রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি মামলায় তিনি ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। ২০১৫ সালের একটি মামলায় তাকে আটক দেখানো হয়েছে। শুক্রবার আদালতে পাঠালে বিচারক তাকে কারাগারে প্রেরণ করেন।
জানা যায়, গত ২০ জানুয়ারি নিজ বাড়ির সামনে দৃর্বৃত্তদের হাতে গুলিবিদ্ধ হন রাকিব। জীবনশঙ্কা নিয়ে প্রায় দেড় মাস ঢাকাতে চিকিৎসা শেষে সম্প্রতি এলাকায় ফেরেন। যশোরে ফিরে তিনি ফের নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকালে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন রাকিব। যখনই যার সাপোর্ট পেতেন তার হয়েই অপরাধসহ নানা কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। রাকিবকে এর আগে একাধিকবার পুলিশ আটক করেছে। পরে জামিনে বের হয়ে ফের একই অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
রাকিবের উত্থান যেভাবে:
রাকিবের স্বজন, স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ছোট বেলা থেকেই উচ্ছৃঙ্খল ছিলেন রাকিব। রাকিবের যেখানে বাসা সেখানে দীর্ঘকাল থেকে মাদক বেচাকেনার হটস্পট। এই মাদক বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে শহরের শংকরপুর, রায়পাড়া এলাকাটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অপরাধ জগতের তালিকাভুক্ত স্পটও। ২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগ যখন প্রথমবার ক্ষমতায় আসে; তখন রাকিব নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিলেন। ওই সময় স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মোস্তফার সঙ্গে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ওসময় তিনি আওয়ামী লীগ নেতার ছত্রছায়া বিভিন্ন অপরাধ কাজের সংক্রিয় হয়ে পড়েন। ২০১০ সালের দিকে স্থানীয় আধিপত্যের জেরে এক যুবককে কুপিয়ে জখম করে। সেই মামলায় হত্যা চেষ্টার আসামি হন রাকিব। এর পর এলাকায় বোমাবাজি, চাঁদাবাজি, দখল, মাদক, ছিনতাইয়ের কাজে নাম আসতে শুরু করে তার।
স্থানীয়রা জানান, বিভিন্ন জায়গায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে ভুক্তভোগীরা এলাকায় রাকিবকে খোঁজ করতেন। তবে শংকরপুর সারগোডাউন এলাকায় রাকিব নামে একাধিক ব্যক্তি থাকায় ভুক্তভোগীরা বিড়ম্বনায় পড়তেন। পরে স্থানীয়রা রাকিবের নামের শেষে ভাইপো বিশ্লেষণ যোগ করে দেন। এর পর অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিস্তরের সঙ্গে তার নামও ছাড়িয়ে পড়ে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে।
অপ্রতিরোধ হয়ে ওঠার নেপথ্যে:
রাকিব প্রথম থেকেই জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের সঙ্গে রাজনীতি করতেন। সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিতি থাকায় সরাসরি শাহীনের সঙ্গে ঘেঁসতে পারতেন না রাকিব। তাই প্রথমে শাহীনের অনুসারী আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মোস্তফা এবং পরবর্তীতে শাহীনের আরেক অনুসারী যশোর পৌরসভার ৬ নাম্বার ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা আলমগীর কবির সুমন ওরফে হাজী সুমনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এরপর তিনি হয়ে উঠেন শহরের এক অংশের অপরাধ জগতের একক নিয়ন্ত্রক। হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় রাকিব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলে; কারাগার থেকে মুক্তি পেতে বেগ পেতে হয় রাকিবের। শাহীন অনুসারীদের কাছে সহযোগিতা না পাওয়ায় পরে স্থানীয় সাংসদ কাজী নাবিলের ঘনিষ্ঠরা তাকে মুক্ত করে। এরপর ২০২১ সালের পর থেকে রাকিব কারাগার থেকে বের হয়ে নাবিল অনুসারীদের সঙ্গে রাজনীতি করতে থাকেন। এরপর রাকিব নাবিলের অনুসারী শীর্ষ সন্ত্রাসী ও শহর যুবলীগের বহিস্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক মেহবুব রহমান ওরফে ম্যানসেলের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তার ইশারাই রাকিব রেলগেট, শংকরপুর এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতেন। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে সহযোগী নয়ন, সাব্বির, আরিফদের নিয়ে নিজেই এলাকায় কিশোর গ্যাং বা একটি গ্যাং গড়ে তোলেন। পুলিশ বলছে, সাবেক পিপি এজেএডএম ফিরোজের ছেলে আবু শাহরিয়ার অর্ণব, খুলনার ট্রাক চালক, হেলপার, শংকরপুরের রিপন, জুম্মানসহ ৪টি হত্যা, ৭টি অস্ত্রসহ ২৩টি মামলার আসামি রাকিব।