বাংলার ভোর প্রতিবেদক
সপ্তাহখানেক পরেই বসন্তবরণ ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। দিবস দুটি ঘিরে সব ধরনের ফুলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। বাজার ধরতেও ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত ফুলের রাজ্যে খ্যাত যশোরের গদখালি-পানিসারার চাষিরা। তবে উৎসবের মৌসুম এলেও কাক্সিক্ষত মুনাফা পাওয়া যাবে কি না-এই দুশ্চিন্তা কাটছে না চাষি ও ব্যবসায়ীদের। তাদের আশঙ্কা, নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ না হলে ফুলের বাজার বড় ধরনের ধসের মুখে পড়তে পারে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রমজানের শুরুতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পড়ে যাওয়ার বিষয়টি, যা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালি-পানিসারা ও আশপাশের এলাকা এখন রঙিন ফুলে ভরে উঠেছে। মাঠজুড়ে ফুটে আছে গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস ও জারবেরাসহ নানা রঙের ফুল। বাতাসে ভাসছে ফুলের ঘ্রাণ। তবে এবারের ব্যস্ততা অন্য বছরের চেয়ে আলাদা। কারণ, ক্যালেন্ডারে এবার শুধু বসন্ত আর ভালোবাসা দিবস নয়, যুক্ত হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনও।
নির্বাচনের একদিন পরেই পহেলা ফাল্গুন ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। নির্বাচনে প্রার্থীদের বরণ, পথসভা ও বিজয় মিছিলে ফুলের চাহিদা থাকে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে গাঁদা ও রজনীগন্ধার চাহিদা থাকে বেশি। আবার বসন্ত ও ভালোবাসা দিবসে গোলাপের বাজার থাকে তুঙ্গে। সব মিলিয়ে তিনটি বড় উপলক্ষ ঘিরে ফুলের চাহিদা আকাশচুম্বী হওয়ার আশা করছেন এ অঞ্চলের হাজার হাজার ফুলচাষি।
তবে সম্ভাবনার এই ছবি যতটা উজ্জ্বল, শঙ্কার দিকটাও ততটাই স্পষ্ট। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাজার বসার দিন ও রমজানের সময়-সবকিছু মিলিয়ে হিসাব মেলাতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে রঙিন স্বপ্ন ম্লান হয়ে যেতে পারে।
গদখালির ফুলচাষি মঞ্জুরুল আলম বলেন, ‘এবার আবহাওয়া ভালো হওয়াতে মাঠে মাঠে ভরে গেছে ফুলে। সব ফুলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। নির্বাচন ও উৎসবকে সামনে রেখে পরিচর্যা ঠিকভাবেই চলছে। নির্বাচন আর উৎসব একসঙ্গে হওয়ায় ফুলের চাহিদা বাড়বে এবং দামও ভালো পাওয়া যাবে। এই কৃষক ও ব্যবসায়ীর ভাষ্য-‘ভালোবাসা বসন্তবরণ উৎসবের আগে সবচেয়ে বড় হাট বসে ১২ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন বাজার বসবে না। ১১ ফেব্রুয়ারি বাজার কতটা জমবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে। আর নির্বাচনের দিন কোনো গোলযোগ হলে পুরোপুরি লোকসানের মুখে পড়তে হবে।’
কাকা ডাকা ভোরে ক্ষেতে উৎপাদিত ফুল নিয়ে শত শত কৃষকেরা হাজির হন যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের গাঁ ঘেসে গড়ে উঠা গদখালি ফুলের বাজারে। শুক্রবার সকালে হাটতে যেয়ে দেখা গেছে সড়কের দুধারে হাজির হন শত শত চাষি। কেউ ভ্যানের উপর, কেউ বা সাইকেলের উপর থরে থরে সাঁজিয়ে রেখেছেন রঙবে রঙের নানা জাতের ফুল। সেখানেও হাজির হয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাইকাররা।
উৎসব আসন্ন হওয়াতে অন্য দিনের চেয়ে এদিন সকাল থেকেই চাষি ও ব্যবসায়ীদের হাকডাকে মুখরিত হয়েছে। চাষিরা বলছেন, ফুলের দাম ভাল। এভাবে বাজার স্থিতিশীল থাকলে লাভবান হওয়া সম্ভব। এদিন গোলাপ বিক্রি হয়েছে ৫ থেকে সাত টাকা পিস, যা গত দুই দিনে ছিলো সর্বোচ্চ ২-৩ টাকা। জারবেরা বিক্রি হয়েছে ১০-১৫ টাকা। রজনীগন্ধা ১২ থেকে ১৫ টাকা পিস। গাঁদা ফুল প্রতি হাজার ৫ থেকে ৬ শ’ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। চাষিরা জানিয়েছেন, সব ফুলের দাম বাড়তে শুরু করেছে, এই দাম বাড়তে থাকবে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
বাজার ধরতে গোলাপের কলিতে ক্যাপ
বসন্তবরণ ও ভালোবাসা দিবসে গোলাপ ফুলের চাহিদা বৃদ্ধি পায় কয়েকগুণ। ফুলচাষিরা এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোলাপ ফুল বিক্রি করে বাড়তি টাকা রোজগার করেন। কিন্তু তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সময়ের আগেই ফুল ফুটে যাচ্ছে। তাই দ্রুত ফুল কেটে ফেলতে হচ্ছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন ফুলচাষিরা। এমন পরিস্থিতিতে ফুল সুরক্ষার জন্য চাষিরা ব্যবহার করছেন ক্যাপ। এই পদ্ধতিতে আগাম ফুল ঝরে পড়া ঠেকাতে কলি বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপ পরিয়ে দেয়া হচ্ছে। ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই ফুল কাটা শুরু হবে। কিছু ফুল কাটা হবে বসন্তের দিন সকালে। আগাম ফুল কেটে রাখলে শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। যেন কলি না ফোটে এবং পাতা ঝরে না পড়ে, সে জন্য কলিতে ক্যাপ পরিয়ে দেন চাষিরা।
পানিসারা এলাকার নীলকণ্ঠ নগরের ফুলচাষি ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘আড়াই বিঘা জমিতে গোলাপ চাষ করেছি। ফুল ফুটেছে অনেক। তবে এখন ফুল কাটলে দাম বেশি পাব না। তাই ফুলের কলিতে ক্যাপ পরিয়ে রাখছি।’ তিনি বলেন, আগে রাবার দিয়ে কলি বেঁধে রাখতাম। এতে ফুলের পাতা নষ্ট হয়ে যেত। এ কারণে ক্যাপ পদ্ধতি ব্যবহার করছি। বিক্রি করার আগ পর্যন্ত কলিতে ক্যাপ পরানো থাকে। এতে ফুলের পাতা যেমন ঝরে পড়ে না, তেমনি ফুল নষ্টও হয় না।
ফুল বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, ‘চলতি মৌসুমের শুরু থেকে ফুলের বাজার ভালোই যাচ্ছে। আবহাওয়াও অনুকূলে এবং মাঠে প্রচুর ফুল রয়েছে। এ কারণে চলতি মৌসুমে শতকোটি টাকার বেশি ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে কি না, তা সংশয় রয়েছে।’

