বাংলার ভোর প্রতিবেদক
সীমান্ত জেলা যশোর। জেলাটিতে যেমন মাদক চোরাচালান বেড়েছে, তেমনি এর ধরনেও এসেছে নতুন পরিবর্তন। চোরাচালান সিন্ডিকেটগুলো
বহনকারী হিসেবে নারীদের ব্যবহার বাড়িয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশ মাদক কারবারি হিসেবে আটক করা হয়েছে নারীদের, এতে উদ্বেগ তৈরি করেছে সচেতন মহলে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল হিসেবে ধরা হয়। যশোর, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়াকে। দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চল চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
মুলোত ভারত সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলগুলোতে প্রায় ৩৬৩ কিলোমিটার নদী ও স্থল সীমান্ত রয়েছে। বিস্তীর্ণ এই সীমান্তপথ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হওয়ায় মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য পাচারের জন্য এ অঞ্চলকে ব্যবহার করছে চোরাচালানকারীরা।
প্রতিদিনই সীমান্ত এলাকা ও জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্যসহ পাচারকারীদের আটক করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এরা বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন পরিবহন ও ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করছে চোরাচালানের সময়।
যশোর জেলা পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের ২৫ তারিখ পর্যন্ত অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে নারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। মার্চ মাসের এ পর্যন্ত তিনজন নারী আটক হয়েছেন। ফেব্রুয়ারি মাসে চারজন এবং জানুয়ারি মাসে দুইজন নারীকে মাদকসহ গ্রেফতার করা হয়।
এর মধ্যে ১২ মার্চ সপ্না নামে এক নারীকে যশোর শহরের মণিহার এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ আইস ও মাদক তৈরির সরঞ্জামসহ আটক হওয়ার ঘটনা বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।
তবে ডিবি পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পারিবারিকভাবে তিনি মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তার দ্বিতীয় বিয়ের পর স্বামীর মাধ্যমে এই কাজে যুক্ত হন বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, গত ২৫ দিনে এ জেলায় ১০৫টি মাদকের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি। কারণ মাদক পাচারকারীরা এখন তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছে।
আগে মাদকবহণকারী হিসেবে পুরুষদের ব্যবহার বেশি হতো, এখন সেখানে কৌশলগত কারণে নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। কারণ নারীদের ক্ষেত্রে সন্দেহ কম হয় এবং তাদের তল্লাশির ক্ষেত্রেও অনেক সময় সামাজিক সীমাবদ্ধতা থাকে। এই সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে চোরাচালান চক্র।
এদিকে বিশ্লেষকদের মতে, নারীদের এই সম্পৃক্ততার পেছনে রয়েছে সামাজিক শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
তাদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে দারিদ্র, কর্মসংস্থানের অভাব ও পারিবারিকভাবে অনেক নারীরা এ কাজে জড়িয়ে পড়ছে। দ্রুত অধিক উপার্জনের প্রলোভন এখানে বড় ভূমিকা রাখছে।
সচেতন মহল বলছে, অনেক ক্ষেত্রে নারীরা সরাসরি অপরাধচক্রের সদস্য না হয়ে বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন। এদের মধ্যে একটি অংশ পরিবারের পুরুষদের দেখে প্রভাবিত হচ্ছে, আবার কেউ কেউ স্বল্প সময়ে অধিক উপার্জনের আশায় যুক্ত হচ্ছে এই কাজে। তবে মূল সিণ্ডিকেট থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
জয়তী সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক অর্চনা বিশ্বাস বলেন, মাদক চোরাচালানের বাহক হিসেবে নারীদের প্রবণতা দিন দিন উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। বিষয়টি মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন। শুধু আইন প্রয়োগ করে এই প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব না। নারীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সৃষ্টি, আর্থিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি সিমান্তবর্তী এলাকায় সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করতে হবে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, মাদক চোরাচালানের সাথে জড়িত মূল সিন্ডিকেট শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি নারীসহ যেসব ব্যক্তি এই অপরাধে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ও নিয়মিত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার এবং বিভিন্ন চেকপোস্টে তল্লাশি জোরদার করা হচ্ছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত, মাদক চোরাচালনে নারীর বাড়তি সম্পৃক্ততা একটি সতর্কবার্তা। এটি শুধু আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জই নয়, বরং সমাজের অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রতিফলন।
এ ক্ষেত্রে সরকারিভাবে সল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলে কর্মসংস্থানে সহায়তা করলে এর প্রবণতা কমে আসবে।
Share.
Exit mobile version