কাজী নূর
ভাল-মন্দ মিলিয়েই সমাজ। আর আমরা সেই সমাজেরই অংশ। আমাদের কেউ ভাল ত কেউ খারাপ। বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন বাজারে শর্ত ছাড়া মিলছে না সয়াবিন তেল। নানা অজুহাতে বাড়তি ডিম-মাছ-মাংস সবজির দাম। সেখানে বাজার ছাড়া অনেক কম দামেও পণ্য বিকোচ্ছেন কেউ কেউ।

শুক্রবার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ৫০ টাকার নিচের নেই কোন সবজি। গরুর মাংসের দাম বেড়েছে কোনরূপ ঘোষণা ছাড়াই। সেই সাথে বেড়েছে খাসির মাংসের দামও। মাছের বাজারেও ছিল উত্তাপ। ডিমের দাম বেড়েছে হালিতে ৪-৬ টাকা। মুরগির দামও চড়া। এরই মাঝে বাজার ছাড়া কম দামে মুরগি বিক্রি করছে বিসমিল্লাহ ব্রয়লার হাউস নামক প্রতিষ্ঠানটি। ২৫/৩০ বছর বয়সের এক যুবক তার পিতাকে সঙ্গে নিয়ে দোকান পরিচালনা করছেন। তার দোকানে টাঙানো বোর্ডের মূল্য তালিকা অবাক হবার মতো। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে খেয়াল করি টাঙানো মূল্য তালিকা অনুযায়ী বিক্রি হচ্ছে মুরগি। অবাক হবার কারণ হচ্ছে এ দোকানটিতে সব জাতের মুরগি বিক্রি করা হচ্ছে অন্যান্য সব দোকান থেকে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ টাকা কমে। টাঙানো দর অনুযায়ী ব্রয়লার মুরগি কেজি প্রতি ১৭০ টাকা, লেয়ার ৩৩০ টাকা ও সোনালী ৩৪০ টাকা।

যেখানে একই বাজারের অন্যান্য দোকানে ব্রয়লার মুরগি কেজি প্রতি ২১০ টাকা, লেয়ার ৩৬০ টাকা ও সোনালী ৩৭০ টাকা বিক্রি হয়েছে। ঘটনাটি যশোরের হাজী মোহাম্মদ মহসিন রোড বড়বাজারের। শুক্রবার সকালে সরেজমিনে বাজার ঘুরে দেখা যায় এ চিত্র।

এ বিষয় চৌরাস্তা এলাকার বাসিন্দা নিরঞ্জন জানান, বাজারের মুরগি পট্টি থেকে এ দোকানে সব জাতের মুরগির দাম অনেক কম। তাই একটি লেয়ার ও একটি সোনালী মুরগি নিয়েছি।

বিসমিল্লাহ ব্রয়লার হাউসের স্বত্বাধিকারী জাকির হোসেন লিটন বাংলার ভোরকে জানান, মুরগি পট্টির বাইরে আমাদের দোকান। তুলনামূলক খরচ কম। তাই কম লাভে ব্যবসা করছি। ‘লাভ সীমিত বিক্রি বেশি’ এই পলিসি প্রয়োগে ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ের লাভ।

বিষয়টির স্বীকারোক্তি দিয়ে মুরগি বাজারের একাধিক বিক্রেতা বলেন, নিচের বাজারের ওই দোকানটি বড় বাজারের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের খরচ কম। বিধায় তারা সীমিত লাভে মুরগি বিক্রি করতে পারে।

সবজির বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে মানভেদে বেগুন কেজি প্রতি ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা, উচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা, কাকরোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, শিম ৮০ থেকে ১০০ টাকা, পটল ৭০ থেকে ৮০ টাকা, কচুর লতি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, বরবটি ৮০ থেকে ৯০ টাকা, পেঁপে ৭০ টাকা, মেটে আলু ৭০ থেকে ৮০ টাকা, পুঁইশাক ২০ টাকা, ডাটা ৩০ থেকে ৪০ টাকা, ধুন্দল ৭০ থেকে ৮০ টাকা, ঝিঙে ৭০ থেকে ৮০ টাকা, কাঁচা আম ৮০ টাকা, কাঁচকলা ৩০ টাকা, টমেটো ৬০ টাকা, বিট ৩০ টাকা, সজনে ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ঢেরস ৪০ থেকে ৫০ টাকা, গাজর ৫০ টাকা, শষা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, কুমড়ো ৪০ টাকা, এঁচোড় ৫০ টাকা, লাউশাক ৪০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৬০ থেকে ৮০ টাকা বিক্রি হয়েছে। এছাড়া লাউ আকারভেদে ৫০ থেকে ৭০ টাকা, বাঁধাকপি ৪০ টাকা পিস, আটি হিসেবে সবুজ শাক ও পালং ২০ টাকা বিক্রি হয়েছে।

বিক্রেতা ফসিয়ার রহমান বলেন, আমি আব্দুলপুরের স্থানীয় মানুষ। ভোরে আব্দুলপুর হাট থেকে সবজি কিনে বড় বাজারে এনে বিক্রি করি। কিন্তু দুই সপ্তাহের উপরে হাটে চাহিদা অনুযায়ী মাল পাওয়া যাচ্ছে না। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আবার বাজারের আড়তগুলোতেও পর্যাপ্ত মাল আসছে না। স্বাভাবিকভাবে তখন খুচরা পর্যায়ে দাম বেড়ে যাচ্ছে।

শহরের খড়কি এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ রুহুল আমিন বলেন, একদিকে জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল নিয়ে মহা তেলেসমাতি কাণ্ড চলছে। তার উপর সবজি, গরুর মাংস, মুরগিসহ নিত্যপণ্যের বাজারে যা চলছে তাতে মনে হচ্ছে শাসক বিহীন রাষ্ট্রে আমরা বাস করছি। রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, এবার জেগে উঠুন, যাদের টাকায় আপনাদের বেতন হয় তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন করুন।

ঘোপ নওয়াপাড়া রোড এলাকার বাসিন্দা লিয়াকত আলী বলেন, কয়েকটি মুদি দোকান ঘুরেও বোতলজাত সয়াবিন তেল মেলেনি। বাধ্য হয়ে খোলা সয়াবিন তেল নিয়ে ফিরছি।

মাছের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে দুই কেজি সাইজের রুই কেজি প্রতি ৩৫০ টাকা, তিন কেজি সাইজের কাতলা ৩৫০ টাকা, পাঙাশ ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা, কৈ ২০০ টাকা, সিলভার কার্প ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, নাইলোটিকা ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, পুঁটি ৪০০ টাকা, মায়া ৩০০ টাকা, টেংরা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, চিংড়ি ৮০০ টাকা, গলদা চিংড়ি ১০০০ টাকা, পাবদা ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকা বিক্রি হয়েছে। এছাড়া সাতশ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২৮০০ টাকা, এক কেজি একশ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৪০০০ টাকা, নয়শ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৩৫০০ টাকা ও পাঁচ পিসে কেজি সাইজের ইলিশ ৬০০ টাকা বিক্রি হয়েছে।

বিক্রেতা আলমগীর হেসেন বলেন, বড় মাছের দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। শুক্রবার বা ছুটির দিনের বাজার এমনই হয়।

গরু ও খাসির মাংসের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে গরুর মাংস কেজি প্রতি ৮০০ টাকা ও খাসির মাংস ১২৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

চালের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে সুপার মিনিকেট কেজি প্রতি ৬৫ টাকা, মিনিকেট ৬২ টাকা, স্বর্ণা ৫৪ টাকা, কাজললতা ৫৬ টাকা, বাসমতী ৮০ থেকে ৮৪ টাকা, নাজিরশাল ৮৪ টাকা, বিলমোটা আমন ৬০ টাকা, আটাশ ৫৬ টাকা ও সুবললতা ৫০ থেকে ৫৫ টাকা বিক্রি হয়েছে।

চাল বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিউ মা কালী ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী অভিজিৎ ভৌমিক বলেন, সামনে নতুন ধান উঠবে। চালের দাম আরো কমতে পারে। এছাড়া বাজার এখন স্থিতিশীল।

ডিমের বাজার ঘুরে দেখা গেছে সব রকম ডিমের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে লাল ডিম হালি প্রতি ৪০ টাকা, সাদা ডিম ৩৬ থেকে ৩৮ টাকা বিক্রি হয়েছে। সেই সাথে কোয়েল, দেশি মুরগিসহ হাঁসের ডিমের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডিমের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা আনিস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুল্লাহ বলেন, কেশবপুর, পাবনা বা বাইরের খামার থেকে ডিম আনার পরিবহন খরচ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। যা ডিমের মূল দামের সাথে যুক্ত হচ্ছে। আব্দুল্লাহ আরো বলেন, শিঘ্রই ডিমের দাম আরো কিছুটা বৃদ্ধির আশংকা রয়েছে।

মুদিপণ্যের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল ২০৫ থেকে ২০৮ টাকা কেজি, বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৬ টাকা লিটার, সরিষার তেল ২১০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি, পাম তেল ১৮৪ টাকা কেজি, আটা ৪০ টাকা, ময়দা ৫৫ টাকা, মসুরি ডাল ৯০ থেকে ১৫০ টাকা, মুগ ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা, ছোলার ডাল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, সাদা চিনি ১০০ থেকে ১০৫ টাকা, এছাড়া আলু ১৬ থেকে ১৮ টাকা, পেঁয়াজ ৩৩ থেকে ৩৫ টাকা, রসুন ১০০ টাকা, আদা ১৬০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।

মুদিপণ্য বিক্রেতা মানিক স্টোরের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ভোজ্যতেল নিয়ে খুব ঝামেলায় আছি। ক্রেতা বোতলজাত সয়াবিন চাইলেও দিতে পারছি না। কোম্পানির বিপণন কর্মীদের বারবার অর্ডার দেয়া হলেও সরবরাহ নেই এমন কারণ দেখিয়ে তারা দায় সারছেন। জাহাঙ্গীর হোসেন আরো বলেন, যারা বোতলজাত সয়াবিন তেলের কারবার করেন মূলত তাদের হাতেই তেলের ঘুড়ির লাটাই। যেমন, সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, টিকে গ্রুপ।

Share.
Exit mobile version