বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে যশোরের দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বেতন বৃদ্ধিকে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে আশঙ্কা করছেন এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। এরপর যশোর শহরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন ভিন্ন মতামত পাওয়া গেছে।

যশোর শহরের চাঁচড়া এলাকার বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী মাহবুবুর রহমান বলেন, দ্রব্যমূল্যের বাজারে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো যৌক্তিক। তবে একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। শুধু বেতন বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না।’

শহরের আরবপুর এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের মনে করেন, সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়লে বাজারে ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে। তিনি বলেন, “বেতন বাড়ানোর আগে বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি ছিল।’

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী শাহিন হোসেন। তার ভাষায়, “সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্যও একটি বৈষম্যের পরিস্থিতি তৈরি হয়। অথচ বেসরকারি খাতে অনেকেই এখনো জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন পান না।”

তবে যশোর শহরের বেজপাড়া এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামো চলছিল। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নতুন বেতন কাঠামো প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এর সঙ্গে জবাবদিহিতা ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের বিষয়টিও যুক্ত করতে হবে।’

অনেকের মতে, দুর্নীতি রোধে শুধু বেতন বৃদ্ধি কার্যকর সমাধান নয়। যশোরের উপশহর এলাকার বাসিন্দা ও ব্যাংক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে অতীতেও দেখা গেছে উচ্চ বেতনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তাই দুর্নীতির মূল কারণ দূর না করে শুধু বেতন বাড়ালে কাক্সিক্ষত ফল নাও আসতে পারে।’

অন্যদিকে সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণাকে স্বস্তির সংবাদ হিসেবে দেখছেন। যশোরের এক সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন পর বেতন কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ কর্মচারীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা।’

বিশ্লেষণ
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে ব্যয় হয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। ফলে একদিকে সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হলেও অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়গুলো নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।

যশোরের সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিরোধিতা করছেন না। তবে তাদের প্রধান প্রত্যাশা হলোÑদুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, সরকারি সেবায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। তাদের মতে, এসব বিষয় নিশ্চিত করা না গেলে বেতন বৃদ্ধির সুফল সীমিত হয়ে যেতে পারে এবং এর চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হবে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামোর ৫০ শতাংশ, পরবর্তী অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বিভিন্ন ভাতা ও আর্থিক সুবিধাসহ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হবে। এখন দেখার বিষয়, এই সিদ্ধান্ত সরকারি কর্মচারীদের জীবনমানে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনে এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের আশঙ্কাগুলো কতটা দূর করতে পারে।

Share.
Exit mobile version