বুলবুল শহীদ খান
যশোর পৌর এলাকায় ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবি’র সাশ্রয়ী মূল্যের পণ্য বিতরণে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ভোগান্তির অভিযোগ করেছেন ভোক্তারা। আগে থেকে প্রচার না করা, নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে পণ্যবাহী ট্রাক আসায় সিংহভাগ মানুষ কাক্সিক্ষত পণ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা। রমজানের সময়ে দরিদ্র ও নিন্মআয়ের মানুষের সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এ পণ্য বিতরণ করা হলেও সুফল বঞ্চিত হচ্ছেন ভোক্তারা। এ বিষয়ে প্রশাসন টিসিবি ডিলারদের সতর্ক করলেও ফল হয়নি।
যশোর পৌরসভার প্রায় তিন লক্ষাধিখ বাসিন্দার জন্য নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন বেলা ১২টার মধ্যে পর্যায়ক্রমে ৫টি ওয়ার্ডে ৫টি ট্রাকের মাধ্যমে প্রতিটি ট্রাকে চারশত প্যাকেট করে দুই হাজার প্যাকেট টিসিবির পণ্য বিক্রির কথা। এই বিতরণ কার্যক্রমে যশোরে এক’শ জন ডিলার অংশ নেবেন। প্রতিদিন ৫ জন করে দায়িত্ব পালন করবেন এবং পুরো কার্যক্রম চলবে ২০ দিন।
গড়ে প্রতি পরিবারে চারজন সদস্য ধরা হলে পৌর এলাকায় প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ হাজার পরিবারের বসবাস। অথচ প্রতিদিন মাত্র ২ হাজার পরিবার পণ্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। ফলে দৈনিক প্রায় ৬৮ থেকে ৭০ হাজার পরিবার এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারপরও যে দুই হজার পরিবার সদস্যরা পণ্য পাচ্ছেন তাদেরকে প্রায় একটি দিন নষ্ট করে অথবা পবিত্র রমজানের ইফতার ত্যাগ করে পণ্য সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
এদিকে পৌরসভার একাধিক ওয়ার্ডে গত তিন দিনে দেখা যায়, নির্ধারিত সময়ের সাড়ে ৫ ঘন্টা পর বিকেল সাড়ে ৫টায় অর্থাৎ ইফতারের কিছু সময় আগে টিসিবির পণ্যবাহী ট্রাকটি এসে পৌঁছাচ্ছে। এতে করে ইফতারের সময় এগিয়ে আসায় দুপুর থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা নিম্নআয়ের মানুষ অনেকেই পণ্য না নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। আবার যারা শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকছেন তাদেরকে তাড়াহুড়া করে দিতে গিয়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। একই সাতে এসব ক্রেতাকে সারাদিন রোজা রেখে ইফতার ত্যাগ করতে বাধ্য হতে হচ্ছে। যেখানে রোজা শেষে দ্রুত ইফতার করার কথা বলা হয়েছে হাদিস শরিফে।
শহরের ভোলাট্যাংক এলাকার বাসিন্দা রবিউল ইসলামের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও পণ্য না পেয়ে তিনি বাড়ি ফিরে যান।
একই এলাকার বাসিন্দা শামসুজ্জামান অভিযোগ করেন, নিয়ম অনুযায়ী একজন ক্রেতাকে একটি করে প্যাকেট দেয়ার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। দ্রুত বিতরণের সময় কেউ দুটি, আবার কেউ চারটি পর্যন্ত প্যাকেট হাতিয়ে নিচ্ছেন। কখনও কখনও মুখ চিনে পণ্য দেয়া হচ্ছে।
শহরের বেজপাড়া এলাকার মিন্টু মিয়া অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে এলাকার বয়স্ক নারী, পুরুষ অপেক্ষা করে অনেকেই ইফতারের জন্য বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।
রেল স্টেশন এলাকার খোকন আলী জানান, পণ্য বিতরণের কোন প্রচার করেনি পৌরসভা। আবার বিতরণের সময় পৌরসভা থেকে নিযুক্ত কর্মকর্তারা করছেন স্বজনপ্রীতি। নিজেদের পরিচিত মুখ দেখে একের অধিক পণ্য বিতরণ করছেন। এতে নির্ধারিত সংখ্যার আরো বেশি মানুষ পণ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
টিসিবির এই পণ্য বিতরণের সময় পৌরসভার দুই জন কর্মকর্তা উপস্থিত থাকেন। একজন কঞ্জারভেন্সি ইন্সপেক্টর আর একজন সহকারী। তবে অভিযোগ উঠেছে তাদের উপস্থিতিতেই চলছে এসব অনিয়ম।
এ ব্যাপারে যশোর পৌরসভার কঞ্জারভেন্সি ইন্সপেক্টর আব্দুর রাজ্জাক মিন্টু বলেন, স্বল্প সময়ে মধ্যে বিতরণ কার্যক্রম শেষ করতে গিয়ে কিছু ক্ষেত্রে একজনকে একাধিক পণ্য দেয়া হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে ডিলারদের দাবি, সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে তাদের পণ্য পেতে দেরি হয়। এ কারণে সময়মতো প্যাকেট প্রস্তুত করা সম্ভব হয় না। শহরের ঝুমঝুমপুর এলাকার ইমন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সিরাজুল হক বলেন, গুদাম থেকে দেরিতে পণ্য দেয়া হচ্ছে। ফলে প্যাকেট করে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে।
শেখহাটি জামরুল তলার মেসার্স রোহান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রোহান জানান, একই সময়ে একাধিক স্থানে পণ্য সরবরাহ করায় দেরি হচ্ছে ।
এ বিষয়ে যশোর পৌর প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, নির্দেশনা অনুয়ায়ী দুপুর ১২ টার মধ্যে টিসিবির পণ্য বিতরণ কার্যক্রম শেষ করার কথা রয়েছে। কেউ এই নিয়ম ব্যত্যয় ঘটালে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবে পৌরসভার জনসখ্যার তুলনায় কম বিতরণের বিষয়ে তিনি বলেন, সীমিত বরাদ্দ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাবের কারণে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পৌরবাসী এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বরাদ্দ বৃদ্ধি করা গেলে পূর্ণ নাগরিক সেবা দেয়া সম্ভব।
এদিকে, সমাজ সচেতনরা বলছেন, বাজার দরের থেকে অনেক সাশ্রয়ী টিসিবির পণ্য। তাই এর চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। তবে বিশৃঙ্খলার কারণে বরাদ্দের তুলনায় আরো কম সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে এই সেবা। তাই এ সেবার মান উন্নয়নে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পণ্য পৌঁছাতে সংশ্লিষ্টদের আরো বেশি সচেতনতা জরুরি।
