বাংলার ভোর প্রতিবেদক
যশোরে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সাম্প্রতিক জেলাভিত্তিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, জেলার সামগ্রিক গড় স্কোর মাত্র ৪০ শতাংশ। যা মধ্যম অবস্থান নির্দেশ করে। তবে মাঠপর্যায়ের সরাসরি পর্যবেক্ষণে গড় স্কোর নেমে এসেছে ২২ শতাংশে। যেটা বাস্তব পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে যশোর উপশহরে প্রশিক্ষিত যুব কল্যাণ সংস্থা (পিযেএস) কার্যালয়ে সাংবাদিক ও সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধিদের নিয়ে আয়োজিত এক শেয়ারিং মিটিংয়ে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন, এডাব যশোরের সদস্য আহসান হাবীব। জেলা ভিত্তিক রিপোর্ট উপস্থাপন করেন, পিযেএস’র পরিচালক কাজী জামিউল ইসলাম ডাবলু। এ সময় পোফ যশোরের পরিচালক হাসান হাফিজুর রহমান, অশ্রুমোচনের পরিচালক শোভা রাণী বাড়ৈ, পিযেএস-এর সমন্বয়কারী আঞ্জুমান আরাসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যশোর জেলার জনসংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৪৭ জন। জেলার আয়তন ২ হাজার ৬০৬ দশমিক ৯৮ বর্গ কিলোমিটার এবং শিক্ষার হার প্রায় ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ। শিক্ষার হার তুলনামূলক ভালো হলেও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তব প্রয়োগে ধারাবাহিকতা ও কঠোরতার অভাব স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মনিটরিং কার্যক্রমে স্কোর ৪০ শতাংশ। পরোক্ষ ধূমপান থেকে অধূমপায়ীদের সুরক্ষা ২১ শতাংশ। স্বাস্থ্য সতর্কীকরণ ৪৫ শতাংশ। বিজ্ঞাপন ও পৃষ্ঠপোষকতা নিষিদ্ধকরণ ৮ শতাংশ এবং তামাকজাত দ্রব্যের কর বাস্তবায়ন মাত্র ১৬ শতাংশ। বিশেষ করে বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ ও কর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে।
প্রশাসনিক মূল্যায়ন ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেছে। সরকারি টাস্কফোর্স সদস্যদের মূল্যায়নে গড় স্কোর ৫৭ শতাংশ হলেও বেসরকারি টাস্কফোর্স সদস্যদের মূল্যায়নে তা ২৭ শতাংশ এবং মাঠপর্যায়ের সরাসরি পর্যবেক্ষণে ২২ শতাংশ। সরকারি প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য সতর্কীকরণে শতভাগ ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে ৮৩ শতাংশ অগ্রগতির দাবি করা হলেও বাস্তব চিত্র তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সূচকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মনিটরিং ২৫ শতাংশ, পরোক্ষ ধূমপান থেকে সুরক্ষা ৪২ শতাংশ, স্বাস্থ্য সতর্কীকরণ ৭৫ শতাংশ, বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধকরণ ৪২ শতাংশ এবং তামাকজাত দ্রব্যের কর বৃদ্ধি ০ শতাংশ।
জাতীয় পর্যায়ের বিশ্লেষণেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০ জেলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ জেলায় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্সের সভা নিয়মিত হয় না। ৭০ শতাংশ জেলা জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলে প্রতিবেদন পাঠায় না এবং ৮৫ শতাংশ জেলায় তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন দৃশ্যমান। এছাড়া ৫০ শতাংশ জেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি হচ্ছে। অধিকাংশ জেলায় তামাক ব্যবহারকারীর নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থাও অনুপস্থিত।
গবেষণায় সুপারিশ করা হয়েছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্সের কার্যক্রম সক্রিয় ও নিয়মিত করা। কঠোর মনিটরিং ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা জোরদার করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের আশপাশে তামাক বিক্রি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। তামাকজাত দ্রব্যের কর বৃদ্ধির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বাজার তদারকি বাড়ানো।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে যশোরে পরোক্ষ ধূমপানসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে। প্রশাসনিক প্রতিবেদনে অগ্রগতির দাবি থাকলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। তাই যশোরকে তামাকমুক্ত জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত ও দৃশ্যমান উদ্যোগ প্রয়োজন।

