কাজী নূর
যশোর সদর উপজেলার আরবপুর ইউনিয়নের মাঠপাড়া পল্লীর যুবক আব্দুস ছলেমান রহিম। যশোর শহরের হাসপাতাল পট্টিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি চায়ের দোকান চালান তিনি। সপ্তাহে একদিন, শুক্রবার সকালে দোকান বন্ধ রেখে বাজারসহ সংসারের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করেন।
শুক্রবার সকালে হাজী মোহাম্মদ মহসিন রোড বড়বাজারে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ক্ষোভ ও হতাশার কথা তুলে ধরেন ছলেমান রহিম। তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে এক কাপ চায়ের দাম ৫ টাকাই রয়ে গেছে। আমাদের মতো চা-ওয়ালাদের আয় বাড়েনি এক পয়সাও। ৫ টাকার জায়গায় যদি ৬ টাকা নিতে চাই, তখনই শুরু হয় অভিযোগ। অথচ চারপাশে সব কিছুর দাম প্রতিদিন ওলটপালট হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ফাস্টফুডসহ নানা খাদ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নির্বিঘ্নে দাম বাড়ালেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে ছলেমান রহিম বলেন, এত দামী বাজার আমাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য নয়। এসব বাজার সমাজের উঁচুতলার মানুষের টেবিলের জন্য।
তার বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে বড়বাজারের মুরগি বাজার, কালীবাড়ি ও নিচের বাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায়—গত সপ্তাহের তুলনায় কিছু সবজির দাম সামান্য কমলেও সামগ্রিকভাবে বাজার এখনো চড়া। মুরগির দাম দুই সপ্তাহ আগে বাড়ার পর এখন স্থিতিশীল থাকলেও সামনে আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিক্রেতারা।
বাজারে বর্তমানে মানভেদে মিষ্টি কুমড়ো কেজি প্রতি ৪০ টাকা, শালগম ৩০ থেকে ৪০, টমেটো ৪০ থেকে ৫০, মটরসুটি ৮০, বিট ৪০, গাজর ৩০ থেকে ৪০, শিম ২০ থেকে ৪০, পুঁইশাক ৩০, লাউশাক ৫০, পালং শাক ৩০ থেকে ৪০, ফুলকপি ৩৫ থেকে ৫০, মেটে আলু ৭০ থেকে ৮০, কাঁচা কলা ৪০ থেকে ৫০, মানকচু ৫০ থেকে ৬০, বাঁধাকপি ২০ থেকে ৩০, ব্রকোলি ৪০, কচুর লতি ৮০ থেকে ৯০, শসা ৬০ থেকে ৯০, কাঁচা মরিচ ৮০ থেকে ১২০ ও বেগুন ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে লাউ বিক্রি হয়েছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়।
সবজি বিক্রেতা ইসমাইল হোসেন বলেন, দাম সামান্য বেড়েছে, এটা ঠিক। কাঁচামালের বাজারে এমন ওঠানামা হয়। কিন্তু আজ শুক্রবারের বাজার হয়েও ক্রেতা খুব কম—এটা অপ্রত্যাশিত।
মুরগির বাজারে ব্রয়লার কেজি প্রতি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা, সোনালি ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা এবং লেয়ার ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাবু ব্রয়লার হাউজের মালিক বাবু মোল্লা জানান, যশোরের অর্ধেকের বেশি খামারে বর্তমানে মুরগি নেই। তীব্র শীতের কারণে অনেক খামারি বাচ্চা তোলেননি বা মারা গেছে। ফলে দাম কমার সম্ভাবনা নেই, বরং বাড়তে পারে।
মাছের বাজারে ৪ কেজি সাইজের কাতলা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, রুই ৩০০ থেকে ৩৫০, পাঙাশ ১৭০ থেকে ২১০, নাইলোটিকা ১৫০ থেকে ১৮০, শোল ৪০০ থেকে ৫০০, টেংরা ৬০০, ভেটকি ৬৫০ ও গলদা চিংড়ি ১২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ৩৪ পিসে কেজি সাইজের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৫৫০ থেকে ৮০০ টাকায়।
মাছ বিক্রেতা দেবব্রত সরকার বলেন, শুক্রবার হিসেবে আজ মাছের দাম তুলনামূলক কম। কিন্তু ক্রেতা নেই বললেই চলে। বিক্রি কম হলে আড়তের দেনা শোধ করাই কঠিন হয়ে পড়ে।
শহরের রবীন্দ্রনাথ সড়কের নলডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা শাহীদুর রহমান বলেন, মাছের দাম আমার কাছে বেশি মনে হয়েছে। তার ওপর মাসের শেষ। তাই বাটা আর নাইলোটিকা নিয়েই ফিরছি।
মুদিপণ্যের বাজারে খোলা সয়াবিন তেল কেজি প্রতি ১৯৫ টাকা, বোতলজাত ১৯৫ টাকা লিটার, সরিষার তেল ২৩০, আটা ৪৫, ময়দা ৫৫, আলু ২০, পেঁয়াজ ৪০ ও রসুন ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মানিক স্টোরের মালিক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বাজার আপাতত স্থিতিশীল। তবে রমজান সামনে রেখে যেন অসাধু চক্র বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি জরুরি।
চাল বাজারে বাসমতি ৮০ থেকে ৮৪, মিনিকেট ৬৪ থেকে ৭৪, আটাশ ৫৬ থেকে ৬০ ও স্বর্ণা চাল ৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
চাল ব্যবসায়ী আবু তাহের সরকার বলেন, দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই। তবে বিক্রি একদম কম। মাসের শুরুতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি।
ডিমের বাজারে লাল ডিম ৩৪ টাকা, সাদা ডিম ৩২ টাকা, হাঁসের ডিম ৭০ টাকা ও কোয়েল ডিম ১০ টাকা হালি বিক্রি হয়েছে। তবে কোথাও কোথাও লাল ডিম ৪০ টাকা হালিতেও বিক্রি হচ্ছে বলে জানান ক্রেতারা।
