বাংলার ভোর প্রতিবেদক
যশোরে দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে কেন্দ্রগুলোতে ছিল প্রাণচাঞ্চল্য। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণকালে দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে যশোর সদর ও ঝিকরগাছায় দুই কেন্দ্রে তিন জামায়াত কর্মী আহত হয়েছেন। সদরে একটি কেন্দ্রে সিল চুরি হয়ে যাওয়ায় ধীরগতিতে ভোট গ্রহণের অভিযোগ উঠে। এছাড়া তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে যশোরের ছয়টি সংসদীয় আসনে ভোটারদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ভোটাররা উপস্থিত হয়ে তাদের ভোট প্রদান করেন। সকালেই যশোর-৩ (সদর) আসনে নিজ কেন্দ্র শহরের ঘোপ এলাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ভোট প্রদান করেন যশোর-৩ সদর আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। ভোট প্রদানের পর অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘যারা মুখে সৎ লোকের শাসন কায়েম করতে চায়, কিন্তু অসৎ পথে ভোটে জিততে চাইবে অসৎ পথে জনপ্রতিনিধি হতে চাইবে সেটা তো কোনোভাবে কাক্সিক্ষত না।’
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আলহামুদিল্লাহ, ভোটে যে বোমা পড়ছে না, সেটাও স্বস্তির জায়গা। ছোট খাট দুএকটি বিচ্যুতি ছাড়া পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিকই আছে। আমরা আশা করছি এভাবে যদি সারাটা দিন পার করতে পারি তাহলে জনগণ সুষ্ঠুভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে এবং জনগণ তাদের আকাক্সিক্ষত জনগণের সরকার আবারও দেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।’
তিনি বলেন, গতকাল সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে টাকার বস্তা উদ্ধারের ঘটনা দেখেছি। এই যশোরেও বিভিন্ন জায়গায় টাকা নিয়ে ঘুরতে দেখেছি বিশেষ একটি রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদেরকে। যেখানে জনগণ সচেতন ছিল, সেখানে হওতো আটকেছে, কোথাও হয়তো ধাওয়া হয়েছে। তবে আমি আস্থা রাখতে চাই জনগণের প্রতি। আমি বিশ্বাস করি জনগণ টাকার বিনিময়ে তাদের পবিত্র আমানত খেয়ানত করবে না।
অপরদিকে, যশোর-৩ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী আব্দুল কাদের সকালে সদরের খোলাডাঙ্গা স্কুলকেন্দ্রে ভোট প্রদান করেন। ভোট প্রদানের পর জামায়াত প্রার্থী আব্দুল কাদের বলেন, ভোট উপলক্ষে এলাকায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। মানুষ ঈদের আনন্দে ভোট দিচ্ছেন। দীর্ঘদিন ভোট দিতে না পারায় এলাকার মানুষের মধ্যে দীর্ঘ নিয়ে খুবই আগ্রহ ছিল।
এছাড়া যশোর সদও আসনের জাতীয় পার্টিও লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্তী খবির গাজী শহরের শংকরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নিজের ভোট প্রদান করে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা আশেক হাসান ও পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল¬াহ সিদ্দিকীসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। এসময় তারা ভোটারদের উপস্থিতি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বলে মন্তব্য করেন।
বেলা সাড়ে ১১ টায় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রথমে সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের দুটি ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখেন। সেখানে ভোটগ্রহণের সার্বিক কার্যক্রম, ভোটারদের দীর্ঘ লাইন, বুথ ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তারা। পরে নতুন খয়েরতলা এলাকার কেন্দ্রগুলোও পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনকালে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও পুলিশ সুপার সরাসরি সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন। ভোট দিতে এসে কোনো ধরনের সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন কি না-তা জানতে চান তারা। ভোটাররা প্রশাসনের এই উদ্যোগে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পারার কথা জানান। একই সাথে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সাথে তারা কথা বলেন।
পরিদর্শন শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা আশেক হাসান জানান, যশোরের প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। উৎসবমুখর পরিবেশে মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও ভোটকেন্দ্রে কড়া নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। জিলা স্কুল ও এমএম কলেজের মতো বড় কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছে।
এদিকে, নির্বাচনী সহিংসতায় যশোর সদরে দুই জামায়াত কর্মী আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে যশোর-৩ (সদর) আসনের তালবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের বাইরে এ ঘটনা ঘটে। আহতরা হলেন সদর উপজেলার নওয়াপাড়া ইউনিয়নের তালবাড়িয়া গ্রামের জামায়াত কর্মী আবু হোসেন (২৫) ও আব্দুল গণি (৫০)।
আহত আবু হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার সকালে তিনি ভোটকেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় বিএনপির সমর্থকরা তার ওপর হামলা চালিয়ে পিটিয়ে জখম করেন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করেন। একই সময়ে আব্দুল গণি ভোট দিতে বাড়ি থেকে বের হলে প্রতিপক্ষের লোকজন তাকে চড়-থাপ্পড় মেরে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনার খবর পেয়ে সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযুক্তরা সেখান থেকে পালিয়ে যায় বলে জানা গেছে।
যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি ফারুক আহমেদ জানিয়েছেন, তালবাড়িয়া স্কুলকেন্দ্রে কোনো ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর তিনি পাননি।
যশোরের ঝিকরগাছায় নির্বাচনী উত্তেজনায় রেজাউল ইসলাম (৩১) নামে এক যুবক ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছেন। তিনি উপজেলার বাইসা গ্রামের নুর আলীর ছেলে। আহত অবস্থায় তাকে শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
আহত রেজাউল ইসলাম জানান, দুপুরের দিকে তিনি বাইসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটের পরিস্থিতি দেখতে যান। এ সময় একই এলাকার নাহিদ নামে এক যুবক তার ওপর হামলা চালিয়ে ছুরিকাঘাত করে।
তিনি আরও জানান, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে এ হামলার ঘটনা ঘটে। ছুরিকাঘাতে তিনি গুরুতর জখম হলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
খবর পেয়ে স্ট্রাইকিং ফোর্স ম্যাজিস্ট্রেট, সেনাসদস্য, বিজিবি ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে আসেন। কর্তব্যরত সেনা সদস্যদের তৎপরতায় পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে। ভোট প্রদান স্বাভাবিক রয়েছে।
ঝিকরগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ দেওয়ান মোহাম্মদ শাহজালাল আলম ছুরিকাঘাতে যুবক আহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
যশোর শহরের রেল রোড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে এক অস্বাভাবিক ঘটনায় ভোটগ্রহণে সাময়িক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রের নারী বুথ থেকে একটি অফিসিয়াল সিল চুরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যার ফলে বেশ কিছু সময় ভোটগ্রহণ কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দেয় এবং ভোটারদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
ভোটারদের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার সকালে ভোটগ্রহণ শুরুর পরপরই নারী কক্ষ থেকে ব্যবহৃত একটি সিল হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো নারী ভোটার সুযোগ বুঝে সিলটি নিয়ে কেন্দ্র ত্যাগ করেন। দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের অসতর্কতা ও অব্যবস্থাপনার সুযোগেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে উপস্থিত ভোটাররা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার ওবায়দুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, সকালে নারী বুথ থেকে একটি সিল হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আমরা নিশ্চিত হয়েছি। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সিল হারানোর কারণে সাময়িকভাবে ভোটগ্রহণের গতি কমে যায়। তবে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নেয়ার পর পুনরায় স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়েছে।
