হিমেল খান :
যশোরের সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় ওষুধ সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। জেলার জেনারেল হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এ সংকট বিরাজ করছে। একই সঙ্গে রয়েছে জনবল সংকট ও আবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতা। ফলে রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হওয়ায় বেড়েছে চিকিৎসা ব্যয়। এ বিষয়ে জেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, এ সংকট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সৃষ্ট। দ্রুত সমাধানের আশা করছেন তারা।

সরজমিনে জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামীণ জনপদের মানুষের জন্য তৈরি হওয়া যশোরের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো থেকে শুরু করে সরকারি সর্বোচ্চ চিকিৎসালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই। সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি ও ব্যথানাশক কয়েক ধরনের ওষুধ ছাড়া বেশিরভাগ ওষুধই রোগীদের দেয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় ওষুধও মিলছে না অনেক ক্ষেত্রে।

যশোর শহরের সদর উপজেলার বিরামপুর এলাকার শিলারায় কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা য়ায়, প্রতিষ্ঠানটি শুধু কাগজে কলমে চালু থাকলেও কার্যক্রম সীমিত। একজন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) ছাড়া সেখানে অন্য কোনো জনবল নেই। ওষুধের মজুদও অত্যন্ত সীমিত।

শিলারায় কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি শহিদুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন ধরে তাদের ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ ছিলো। তবে গত মাসের ১২ তারিখ এক কার্টন ওষুধ পাওয়া গেলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী এলেও সবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

শুধু শিলারায় নয়, একই চিত্র দেখা গেছে উপজেলার দত্তপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকেও। সেখানে কয়েকটি কক্ষ তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। অন্যদিকে শার্শা উপজেলার ডিহি ইউনিয়নের একটি কমিউনিটি ক্লিনিক দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

ওষুধ সংকট ও চিকিৎসা সেবার মান ভালো না থাকায় দিন দিন কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর প্রতি আস্থা হারাচ্ছে গ্রামীণ জনপদের মানুষ। ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ছুটছেন।
বিরামপুরের বাসিন্দা মুক্তা আক্তার জানান, অসুস্থ হলে আগে তারা কমিউনিটি ক্লিনিকে যেতেন। কিন্তু এখন সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ না পাওয়ায় অন্যত্র যেতে হচ্ছে।

একই এলাকার অনিমেষ হালদার বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকে গেলে নাপা কিংবা হিস্টাসিনের মতো কয়েকটি সাধারণ ওষুধ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না। প্রয়োজনীয় অধিকাংশ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়।

আরবপুর ইউনিয়নের ধর্মতলা এলাকার বাসিন্দা সামসের আলী বলেন, ক্লিনিকে নিয়মিত ওষুধ পাওয়া যায় না। সেবার মান নিয়েও মানুষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।

শার্শা উপজেলার ডিহি ইউনিয়নের বাসিন্দা নার্গিস বেগম জানান, তাদের এলাকার একমাত্র কমিউনিটি ক্লিনিকটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। ফলে পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য শহরের হাসপাতালে যেতে হয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থায় যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনও রয়েছে। তবে বর্তমান সরকারের সময়ে আবার ওষুধ সরবরাহ শুরু হয়েছে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তারা আশা করছেন।

এ অবস্থায় মানুষের চাপ বেড়েছে যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। এখানে ২৭৮টি শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন চিকিৎসা নিচ্ছেন ৮শ রোগী। তীব্র ওষুধ সংকটে নাজেহাল অবস্থা বিরাজ করছে এ হাসপাতালেও।

এখানে চিকিৎসা নিতে আসা আলোমগীর হোসেন জানান, হাসপাতালের ডাক্তার প্রেসকিপশনে ওষুধ লিখে দেয়ার পরও হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে কোন ওষুধ পাচ্ছেন না তারা।

হাশিমপুর এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আরেক জন রোগী আরিফা জানান, হাসপাতালে ফার্মেসিতে সামান্য জ্বরের ওষুধ নাপাও পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আশা করছেন সামনের অর্থবছরে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হুসাইন শাফায়েত জানান, কমিউনিটি ক্লিনিক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ না থাকায় সদর হাসপাতালে রোগীর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। প্রতিদিন শয্যা সংখ্যার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসছেন। সীমিত মজুদের কারণে সবাইকে প্রয়োজনমতো ওষুধ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, নতুন অর্থবছরে ওষুধ সরবরাহ ও বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তারা আশা করছেন।

বর্তমানে সীমিত মজুদের মধ্যে অতি দরিদ্র ও অস্বচ্ছল রোগীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে।

জেলা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, যশোরে সরকারি চিকিৎসালয়ের মধ্যে রয়েছে জেনারেল হাসপাতাল, ৮টি উপজেলায় ৮টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ২৮৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক, টিবি ক্লিনিক, টিবি হাসপাতাল ও শিশু ও মাতৃমঙ্গল হাসপাতাল। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেন।

তবে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জনবল সংকটের কারণে কাক্সিক্ষত সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নিম্নআয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ, যাদের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবাই চিকিৎসার প্রধান ভরসা।

Share.
Exit mobile version