বাংলার ভোর প্রতিবেদক
ঝিকরগাছার পৌর শহর থেকে দক্ষিণের একটি গ্রাম বড় কলসি। উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের এই গ্রামটির বাজারে অবস্থিত আমজেদ টি স্টল। সোমবার গোধূলিলগ্নে দোকানটিতে পাঁচ থেকে সাত জনের ভিড়। কেউ চায়ের অর্ডার দিয়ে বসে আছেন; কেউবা চা পান করছেন। সবার নজরই দোকানের ভিতরে থাকা টেলিভিশনের দিকে। সবাই মনোযোগ দিয়েই দেখছেন খবর। এর মধ্যে একজন বলে উঠলেন- ‘আমাগের আসনে প্রার্থী কয়ডা? কেউ বললেন দাঁড়িপাল্লা, ধানের শীষের ক্যান্ডিডেট ছাড়া তো কাউরে দেখি নে। আবার আরেকজন বলে উঠেলেন ক্যান নাঙ্গলও তো দাঁড়ায়ছে। অন্য পাশ থেকে আরেক জন বলে উঠলেন, দাঁড়িপাল্লা আর ধানের শীষের ক্যান্ডিডেট ছাড়া তো কাউরে চিনি নে। এবার পোস্টার না থাকায় ক্যান্ডিডেট তো চিনতে পারতিছিনে।’ শুধু চায়ের দোকানে উপস্থিত ভোটাররাই নন, এ চিত্র পুরো নির্বাচনি এলাকার। ঝিকরগাছার ও চৌগাছা উপজেলা নিয়ে যশোর-২ আসন গঠিত। আসনটিতে ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটারদের কাছে পরিচিত বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল জামায়াত ও বিএনপির প্রার্থী ছাড়া বাকি ৬ জনই অপরিচিত। জেলার ৬টি আসনের ৩৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ১৩ জন প্রার্থীকে চিনেন না ভোটাররা। অনেক ভোটার চেনেন না তাদের। কারও কারও নির্বাচনী অফিসও নেই।
সচেতন নাগরিক কমিটির যশোরের সভাপতি পাভেল চৌধুরি বলেন, ‘যশোরে এক তৃতীয়াংশ অপরিচিত। অনেকেই প্রার্থী হয়েছেন নামকাওয়াস্তে। এসব প্রার্থীদের সাধারণ দুটি উদ্দেশ্য থাকে; একটি অসৎ; অন্যটি পরিচিত হওয়াতে। আবেগে প্ররোচিত হয়েও অনেকেই প্রার্থী হন। তাছাড়া এবার পোস্টার না থাকাতে অপরিচিত প্রার্থীদের চিনতেও পারছেন না ভোটাররা।’
যশোর -১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চারজন। বিএনপির নুরুজ্জামান, জামায়াতের আজীজুর রহমানের জমজমাট প্রচারণা শার্শাবাসী দেখলেও; জাতীয় পার্টির জাহাঙ্গীর আলম চঞ্চল ও ইসলামী আন্দোলনের বক্তিয়ার রহমানের প্রচারণা তেমন দেখা যায়নি। জাতীয় পার্টির প্রার্থী জাহাঙ্গীর চঞ্চল বলেন, ‘আমাদের কর্মী সমর্থক কম; যেটুকু পারছি প্রচারণা চালাচ্ছি।’ যশোর-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী ৮ জন। এর মধ্যে মাঠে প্রচারণায় সরগরম রয়েছেন বিএনপির সাবিরা সুলতানা ও জামায়াতের মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ। প্রচারণাতে দুই পক্ষের কর্মীদের মধ্যে হামলা পাল্টাপাল্টি হামলাসহ নানা অভিযোগের ঘটনা ঘটেছে। বাকি ছয়জন ইসলামী আন্দোলনের ইদ্রিস আলী, বাসদের ইমরান খান, বিদ্রোহী জহুরুল হক, স্বতন্ত্র মেহেদী হাসান, বিএনএফ শামছুল হক ও এবি পার্টির রিপন মাহমুদের প্রচারণা তেমন দেখা যায়নি। স্থানীয় ভোটাররা তাদের চিনেন না বলেও জানান। এর মধ্যে বিদ্রোহী বিএনপি নেতা জহুরুল হক বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। যশোর-৩ (সদর) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ছয় জন। এর মধ্যে বিএনপির অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জামায়াতের আব্দুল কাদের, জাতীয় পার্টির খবির গাজী, ইসলামী আন্দোলন শোয়াইব হোসেনের ব্যাপক প্রচারণা করতে দেখা গেছে। তবে, জাগপার নিজামউদ্দিন অমিত ও কমিউনিস্ট পার্টির রাশেদ খান শহরে মাঝে মধ্যে প্রচরণা চালালেও গ্রামাঞ্চলে ভোটাররা তাদের চিনেন না। কার্যালয়ও দেখা যায়নি তাদের।
যশোর-৪ আসনে আটজন প্রতিদ্বিন্দ্বিতা করলেও প্রচারণায় পরিচিত মুখ বিএনপির মতিয়ার ফারাজী ও জামায়াতের গোলাম রসুল। মাঝে মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের বায়েজিদ হোসাইন প্রচারণা চালালেও এবার ভোটের মাঝে প্রচারণাতে দেখা যায়নি খেলাফত মজলিশের আশেক এলাহী, জাতীয় পার্টির জহুরুল হক, বিএমজেপির সুকৃতি মন্ডল। এসব প্রার্থীদের নিজ গ্রাম ছাড়া নির্বাচনী কার্যালয়ও চোখে পড়েনি। বিএমজেপির সুকৃতি মন্ডল বলেন, ‘তেমন একটা মাঠে যাওয়া হয়নি। মাঠে যেতে পারিনি বলে লোকজন পরিচিত কম। তবে তার প্রচারণা চলছে বলে দাবি করেন তিনি।
যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে ছয়জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও পরিচিত মুখ জামায়াতের গাজী এনামুল হক, বিএনপির রশীদ আহমাদ, স্বতন্ত্র শহীদ ইকবাল। এই তিন প্রার্থীর ত্রিমুখি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রচারণায় দেখা যায়নি জাতীয় পার্টির এমএ হালিম, স্বতন্ত্র কামরুজ্জামান, ইসলামী আন্দোলনের জয়নাল আবেদীনের। এই তিন প্রার্থী কর্মী সংকটেওে সকল কেন্দ্রে দিতে পারছেন না পোলিং এজেন্ট। যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে পাঁচজন প্রতিন্দ্বিন্দ্বিতা করলেও প্রচারণায় এগিয়ে বিএনপির আবুল হোসেন আজাদ ও জামায়াতের মোক্তার আলী। মাঠে অপরিচিত মুখ জাতীয় পার্টির জি এম হাসান, এবি পার্টির মাহমুদ হাসান, ইসলামী আন্দোলনের শহিদুল ইসলাম। ভোটাররা চেনেন না তাদের। নির্বাচনী অফিসও দেখা যায়নি তাদের। সাধারণ ভোটারের অনেকেই বলেছে, যারা নির্বাচিত হবেন তারা দেশের জন্য আইন তৈরি করবেন, এলাকার উন্নয়ন করবেন। অথচ এবার নির্বাচনে এমন অনেকেই দাঁড়িয়েছেন, যাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের পরিচয় নেই, যোগাযোগও নেই।

