‘আমরা অভিযান চালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছি; অভিযান চালালে সমাজের নানা শ্রেণী পেশার মানুষ এসব যানের মালিকদের রুটি রুজির কথা বলে’

বাংলার ভোর প্রতিবেদক
এনজিও কর্মী শহিদুল আলম যশোর শহরের আরবপুর পাওয়ার হাউজ পাড়ার বাসিন্দা। বাসা থেকে শহরের চার খাম্বা মোড়স্থ তার অফিসের দূরত্ব চার কিলোমিটার। সাধারণত রিকশায় করে অফিসে যেতে সময় লাগে মিনিট বিশেকের মতো। কিন্তু তিনি প্রায় এক ঘণ্টা সময় হাতে রেখেই রওনা দেন। তারপরও সড়কের তীব্র যানজটের কারণে সময়মতো পৌঁছাতে পারেন না অফিসে। প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার সকালেও কোর্ট মোড়ে যানজটে আটকা পড়ে রিকসার ভিতরে বিরক্ত তিনি। জানতে চাইলে তিনি বলছিলেন, ‘ইদানীং শহরে চাহিদার চেয়েও যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। ব্যস্ততম সড়কের মোড়ে মোড়ে যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে। সড়কে বের হলেই বিরক্ত লাগে। ছোট্ট শহরেও বড় শহরের মতো যানজট। ট্রাফিক পুলিশের অব্যবস্থাপনা তো আছেই। এর ফলে আগেভাগেই বাসা থেকে বের হতে হচ্ছে।’ যশোর শহরে অবৈধ রিকসা- ইজিবাইকের চাপ বেড়ে যাওয়ায় সড়কগুলোতে অসহনীয় যানজটে শহিদুলের মতো কয়েক লাখ মানুষ প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাচ্ছে।

যশোর পৌরসভা কার্যালয় সূত্র মতে, শহরে পা চালিত (প্যাডেল) অনুমোদিত রিকশার সংখ্যা ১৫শ’। অনুমোদিত ইজিবাইকের সংখ্যা ২ হাজার ৯৭৫ ও স্মার্ট রিকশার সংখ্য ২৯ টা। অথচ অনুমোদনবিহীন রিকশা, ইজিবাইক ও ব্যাটারি চালিত রিকশা প্রায় ২০ হাজারের বেশি। এতে যানজট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অসহনীয় যানজটে দুর্ভোগে পড়ছে সাধারণ মানুষ। বিশেষত জেলা শহরের ব্যস্ততম দড়াটানা, চিত্রা মোড়, জজকোর্ট মোড়, হাসপাতাল মোড়, কুইন্স হাসপাতালের সামনে, পোস্ট অফিসের সামনে, চিত্রার মোড়, চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড, চৌরাস্তা ও মণিহার এলাকার সব সময় যানজট লেগেই থাকে। শহরবাসীর ভাষ্য, তিন চাকার যানবাহনের কারণে শহরের সব সড়ক অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। দুর্ঘটনার আতঙ্ক নিয়ে পথচারীদের চলাফেরা করতে হচ্ছে। সড়কে তিন চাকার যানের দাপট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেই। তবে পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, তিন চাকার যান কমাতে আট বছর ধরে পৌরসভা থেকে কোনো নিবন্ধন দেয়া হচ্ছে না। কিন্তু আশপাশের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিবন্ধন নেয়া ইজিবাইক শহরে ঢুকে পড়ছে। জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া অবৈধ যান নিয়ন্ত্রণ করা পৌরসভার একার পক্ষে সম্ভব নয়।

নাগরিক অধিকার আন্দলন যশোরের সমান্বয়ক শেখ মাসুদুর রহমান মিঠু জানান, শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সড়ক আটকিয়ে রাস্তায় গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে যানজট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রিকসা ইজিবাইক চলছে। এখনই সঠিক ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে শহরে যানজট মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।’
যানজটে বিরক্ত ইজিবাইক রিকসা চালকেরাও। কোর্ট মোড়ে কয়েকজন রিকসা ইজিবাইক চালক জানান, ‘শহরে যারা রিকসা ইজিবাইক চালায়, তাদের বেশির ভাগ আসে শহরতলী কিংবা বিভিন্ন উপজেলা থেকে। গ্রামের চেয়ে শহরে কম সময়ে বেশি ভাড়া পাওয়া যায় বলেই শহরে যাতায়াত বেশি। তাছাড়া ইজিবাইক রিকসা চালানো তো বেশি কষ্টের কাজ না। তাই অনেক মানুষ গ্রামাঞ্চলে কৃষি বা অন্য শ্রমিকের কাজ না করে এই পেশায় আসছে।

তৈয়ব মোল্লা নামে এক রিকসা চালক বলেন, ‘ভিড়ের ভিতরে রিকসা চালাতে কষ্ট হয়। বেশিক্ষণ জ্যামে আটকা থাকাতে ব্যাটারির চার্জ কমে যায়। প্রত্যেক দিন শহরে জ্যাম। এতে ভাড়াও পাওয়া যাচ্ছে না।’

যশোর ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টার মাফুজুর রহমান বলেন, ‘বৃটিশ জেলা শহরের রাস্তাগুলো অনেক সরু। এই সরু সড়কে আবার ফুটপাট দখল করেছে ভাসমান দোকানদার। আবার দিন দিন শহরে মানুষের চাপ বাড়ছে। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেকে বেশি রিকসা ইজিবাইক চলে শহরে। ফলে যানজট প্রকট আকার ধারণ করছে। আমরা অভিযান চালানোর চেষ্টা করছি; কিন্তু পৌরসভা থেকে সহযোগিতা পাচ্ছি না। আমরা অভিযান চালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছি; অভিযান চালালে সমাজের নানা শ্রেণী পেশার মানুষ এসব যানের মালিকদের রুটি রুজির কথা বলে। ফলে আমরা উভয় সংকটে রয়েছি। তার পরেও আমরা শহরবাসীকে স্বস্তি দিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছি।

যশোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী কামাল হোসেন বলেন, ‘শহরে যানজট আগের থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে সত্য। নতুন করে গাড়ির নিবন্ধন দিচ্ছি না। নানা কারণে রিকসা ইজিবাইক অভিযান চালানো যাচ্ছে না। তবে ফুটপাত উচ্ছেদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দ্রুতই অবৈধ যানবাহন চলাচলে অভিযানে নামার আশ্বাস দেন তিনি।’

Share.
Exit mobile version