বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
যশোরের মণিরামপুর উপজেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আহসান হাবিব লিটনসহ দলটির তিন নেতার পদ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। অপর দুই নেতা হলেন জেলা শুরা সদস্য মহিউল ইসলাম ও পৌর টিম সদস্য ফারুক হোসেন। গত ৫ জুন শুক্রবার উপজেলা জামায়াত কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক জরুরি দায়িত্বশীল বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
একই দিনে মাগুরা জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক মাওলানা এমবি বাকেরকেও পদ থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
জেলা ও উপজেলা জামায়াতের একাধিক নেতা পদ স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ঠিক কী কারণে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি। তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৩০ এপ্রিল মণিরামপুরে হরিহর নদ খনন থেকে উত্তেলিত মাটি বিক্রির অর্থ ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যায় মণিরামপুর বাজার এলাকায় সংঘটিত ওই সংঘর্ষে আহসান হাবিব লিটন, মহিউল ইসলামসহ উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। এ সময় উপজেলার জামায়াতের কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
ঘটনার পর বিএনপি ও জামায়াত পৃথকভাবে মনিরামপুর থানায় মামলা করলেও পরবর্তীতে উভয় দলের স্থানীয় নেতাদের উদ্যেগে বিষয়টি মিমাংসা করা হয়।
সংঘর্ষের ঘটনার পর এর কারণ অনুসন্ধানে জেলা জামায়াতের তিন সদস্য বিশিষ্ট্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটির প্রধান ছিলেন জেলা কর্মপরিষদ সদস্য আরশাদুল আলম। সদস্য হিসেবে ছিলেন জেলা সহকারী সেক্রেটারি মনিরুল ইসলাম এবং দলটির সহযোগী সংগঠন জেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুল মালেক। তারা সরেজমিনে মণিরামপুরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করেন।
তদন্তে উপজেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আহসান হাবিব লিটনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠে আসে বলে দলীয় সূত্র দাবি করছে। এর মধ্যে রয়েছে, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী গাজী এনামুল হক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার, গরুর হাটের ইজারা কর্যক্রমে অংশগ্রহণের নামে আর্থিক সুবিধা গ্রহণসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকান্ডে সম্পৃক্ততা।
এছাড়া ৩০ এপ্রিলের সংঘর্ষের ঘটনায় আহসান হাবিব লিটন, মহিউল ইসলাম এবং ফারুক হোসেনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণও পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সুত্র জানিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই জেলা জামায়াত তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।
দলটির অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ জুন শুক্রবার উপজেলা জামায়াত কার্যালয়ে জরুরি দায়িত্বশীল বৈঠকে আহসান হাবিব লিটনের দরীয় পদ থেকে দুই মাস জন্য, মহিউল ইসলামের পদ থেকে তিন মাসের জন্য এবং ফারুক হোসেনের পদ দুই মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। বৈঠকে উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন ইউনিয়নের অমির ও সেক্রেটারিরা উপস্থিত ছিলেন।
দলীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা জামায়াতের আমির ফজলুল হক ওই সময় ঢাকায় একটি দলীয় সভায় অবস্থান করায় উপজেলা সেক্রেটারি খলিলুর রহমান জেলা জামায়াতের সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। সিদ্ধান্তটি প্রথমদিকে গোপন রাখা হলেও সম্প্রতি বিষয়টি দলীয় নেতাতর্মীদের মধ্যে আলোচনায় আসলে পরে প্রকাশ্যে আসে।
এ বিষয়ে উপজেলা জামায়াতের আমির ফজলুল হক বলেছেন, ওই তিন নেতার পদ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়। চাঁদাবাজি, মাটি বিক্রির অর্থ ভাগাভাগি কিংবা, টেন্ডারবাজির অভিযোগ সঠিক নয়।
তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি আমাদের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, দলের বাইরে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক শাহবুদ্দিন আহমেদ তিন নেতার পদ স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারেণ তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে কী ধরনের শৃংখলাভঙ্গের ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে তিনি রাজি হননি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে মণিরামপুর উপজেলা জামায়াতের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গ্রুপিংয়ের অভিযোগও উঠে এসেছে। বিশেষ করে ভোজগাতী, ঢাকুরিয়া, নেহালপুর, চালুয়াহাটী ও খেদাপাড়া ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্ধারণকে কেন্দ্র করে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় উপজেলা জামায়াতের আমির ফজলুল হক এবং সহকারী সেক্রেটারি আহসান হাবিব লিটন ও শামীমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ঘটনার তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান ও জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য আরশাদুল আলম বলেন, মণিরামপুরের তিন নেতার পদ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। আমি তদন্ত কমিটির দায়িত্বে ছিলাম, তবে সিদ্ধান্ত দিয়েছে জেলা জামায়াত।
এদিকে মাগুরা জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মাওলানা এমবি বাকেরকে পদ থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মাগুরা জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির অধ্যাপক মাওলানা সাইদ আহমেদ বাচ্চু।
তিনি জানিয়েছেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাংগঠনিক ত্রুটির কারণে সাময়িকভাবে তার পদ স্থগিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অধ্যাপক মাওলানা এমবি বাকের বলেন, অসুস্থতার কারণে পদ থেকে অব্যহতি চেয়ে কেন্দ্রে আবেদন করেছিলাম। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
