পৃথিবীর ইতিহাসে যত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, সেখানে কেউই আসলে পরাজিত কিংবা বিজয়ী হয়নি! বরং প্রতিটি যুদ্ধেই মানবতা চরমভাবে পরাজিত হয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় আমরা বহু যোদ্ধার বীরত্বগাথা ভূমিকা দেখতে পাই। যুগ যুগ ধরে সাহিত্য, লোকগীতি, মঞ্চনাটক ও কবিতায় যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের অবদানকে গৌরবান্বিত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, যুদ্ধের এ গৌরবান্বিত ধারণাটি যুদ্ধের এক ভয়াল ও অন্ধকার সত্যকে আড়াল করেছে। এ সত্যটি হলো, যুদ্ধ সর্বদাই মানবতার জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। বীরত্বের স্তুতিনামা বরাবরই নিরীহ মানুষের মৃত্যু, ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরী, বিবর্ণ জনপদ, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষতির চিত্র তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়।
যুদ্ধের পক্ষে যে কোনো যুক্তির ঊর্ধ্বে এটি ধ্বংস, যন্ত্রণা ও বর্বরতার প্রতীক।একেকটি যুদ্ধ মানবজাতিকে কোটি কোটি মানুষের লাশ ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি। এসব যুদ্ধে যোদ্ধাদের যত বড় বীরত্বের গল্পই থাকুক না কেন, যুদ্ধগুলো মানবজাতিকে ইতিবাচক কিছু দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্বের ধারণা প্রায়ই সহিংসতাকে স্বাভাবিক হিসাবে তুলে ধরে। কিন্তু সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণই মানবজাতির জন্য ভয়াবহ ও দুর্বিষহ ভবিষ্যৎকে ত্বরান্বিত করে। যখন বীরত্বের খোলসে সহিংস আচরণ, বর্বর হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলার তারিফ করা হয়, তখন তা পরবর্তী প্রজন্মকে অমানবিক বীরত্বের জন্য উৎসাহিত করে। যখন হত্যাকাণ্ড সাহসিকতার সমার্থক হয়ে ওঠে, তখন এটি মানবজীবনের পবিত্রতাকে কলুষিত করে। যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতাকে আড়াল করে সৈনিক কৃর্তক হত্যাকাণ্ডের তারিফ করার অবশ্যম্ভাবী ফলাফল স্বরূপ পৃথিবীতে সংঘটিত হচ্ছে এত যুদ্ধবিগ্রহ ও প্রাণহানি। যদিও বাহ্যিকভাবে আমরা দেখি, যুদ্ধে একদল বিজয়ী ও অন্যপক্ষ পরাজিত হয়েছে। যদি প্রশ্ন করা হয়, এ বিজয় কিসের বিনিময়ে? উত্তর হচ্ছে-অসংখ্য মানুষের মৃত্যু, বহু মানুষের অসহায় পঙ্গুত্ব, অর্থনীতির পতন, জাতীয় জীবনে অস্থিরতা ও নিরাপদ আশ্রয়স্থলের জন্য নিরুপায় সাধারণ মানুষের দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করার বিনিময়ে। যা যুদ্ধের যে কোনো ইতিবাচক অর্জনের ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। এমনকি বিজয়ী যোদ্ধারাও বাকি জীবনটা যুদ্ধের মানসিক ক্ষত বহন করে চলেন। প্রতিটি যুদ্ধেই কে হারবে আর কে জিতবে, তা অনির্ধারিত হলেও এটা নির্ধারিত যে, যুদ্ধে মানবতা পরাজিত হবে। অর্থাৎ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিজয়ীরাও যুদ্ধে পরাজয়ই বরণ করে।মোট কথা, বিজয়ী ও পরাজিত শক্তি উভয়ের জন্যই যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি হলো পরাজয়, ক্ষতি ও নৈতিকতার অবক্ষয়।
যুদ্ধের পর বীরত্বকে উদযাপন করা কখনো কখনো প্রতিশোধ পরায়ণতা ও ঘৃণার চক্রকে উসকে দিয়ে নতুন সংঘাত সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যখন অক্ষশক্তি পরাজিত হয়, তখন তাদের ওপর কিছু লজ্জাজনক শর্ত আরোপ করা হয়। অন্যদিকে মিত্রশক্তি তখন যুদ্ধ জয়ের উল্লাসে ব্যস্ত। তাদের এ বিজয়োল্লাসই অক্ষশক্তিকে প্রতিশোধ পরায়ণ করে তোলে, যার ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা পৃথিবীকে প্রায় ৭ কোটি মানুষের মরদেহ উপহার দেয়। এভাবেই প্রতিশোধের চক্র চলতে থাকে বিধায় পুরো মানবজাতিই ভোগান্তির শিকার হয়। অথচ, যুদ্ধের রসদ ক্রয় না করে এ অর্থ যদি একটি দেশ তার দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষার প্রসারসহ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যয় করতে পারে, তাহলে তা দেশকে সমৃদ্ধির শিখরে আরোহণে সহায়তা করবে।
এ পর্যায়ে মনে প্রশ্ন আসতেই পারে…তবে কি বীরত্ব প্রদর্শন অপরাধ? মোটেও না; তবে সত্য, ন্যায়, মজলুমকে রক্ষা, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম, শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য বীরত্ব লালন করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, শান্তিপূর্ণ সমাধানই মহান বীরত্বের প্রতীক। অপরদিকে, পৈশাচিক বীরত্ব প্রদর্শন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধ অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধ। আমরা বরং প্রকৃত বীরত্বের ধারণাকে বিশ্লেষণ ও উৎসাহিত করতে পারি। প্রকৃত বীরত্ব যুদ্ধক্ষেত্রে নয়; বরং এটি শান্তি, বোঝাপড়া, সহমর্মিতা ও সহাবস্থানের পথে বিদ্যমান। যারা সমস্যার সমাধান রক্তপাতহীনভাবে করতে পারে, বিভক্ত জাতিকে শান্তিপূর্ণভাবে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে এবং মানবাধিকার রক্ষার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেন, তারাই প্রকৃত বীর।
যুদ্ধ ও মানবতার বিপর্যয় একে অপরের সাথে গভীরভাবে জড়িত। যুদ্ধ কেবল ভৌগোলিক সংঘাত নয় বরং এটি লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু,বাস্তুচ্যুতি, চরম দারিদ্র্য এবং মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের কারণ যা সভ্যতাকে পিছিয়ে দেয়। পূর্ব কাল থেকে শুরু করে বর্তমানের যুদ্ধ গুলো প্রমাণ করে যে, যুদ্ধ মানেই মানবতা ও উন্নয়নমূলক অবকাঠামোর চরম ধ্বংসলীলা।
যুদ্ধে সামরিক মৃত্যুর চেয়ে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি হয়। সরাসরি মৃত্যু ছাড়াও দুর্ভিক্ষ এবং যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট রোগব্যাধিতে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। মানুষ নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়যা বিশ্বজুড়ে বিশাল শরণার্থী সংকটের সৃষ্টি করে। যুদ্ধ একটি দেশের রাস্তা, সেতু, বিদ্যালয় এবং হাসপাতাল ধ্বংস করে দেয় যা স্থানীয় অর্থনীতিকে পুরোপুরি স্থবির করে ফেলে এবং কর্মসংস্থান নষ্ট করে। যুদ্ধের ফলে বাস্তুতন্ত্র বিঘ্নিত হয়প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট হয় এবং পরিবেশ দূষিত হওয়ার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তীব্র উদ্বেগ দীর্ঘ মেয়াদে মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত তৈরি করে। যুদ্ধের সময় স্কুলপড়ুয়া শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা সামগ্রিক সভ্যতার জন্য চরম লজ্জা এবং মানবতার পরাজয়।
পরিশেষে এতটুকু বলাই যায়…কোনো যুদ্ধেই আসলে কেউ জয়ী হয় না প্রতিবারই মানবতার পরাজয় ঘটে।
অপেক্ষা…সময়ের, যখন মানবজাতি ভয়ংকর যুদ্ধবিধ্বস্ত অতীত থেকে মুক্তি পাবে। কোনো শক্তিই মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে দমিয়ে রাখতে পারে না। ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা ভৌগোলিক সীমারেখা সকল কিছুর ঊর্ধ্বে বিবেক জাগ্রত হোক, জয় হোক মানবতার
লেখক : সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ,
পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি
(কেন্দ্রীয় পুনাক)
