হিমেল খান
এ যেন অতীতের ফ্লাশব্যাক। ঠিক যেভাবে বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে কোরবানীকে সামনে করে বাড়ানো হতো লবণের আর দাম কমানো হতো চামড়ার দাম। তার প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে এ বছরও। আসন্ন কোরবানির ঈদ সামনে করে বাড়ছে লবণের দাম আর সেই সাথে পাল্লা দিয়ে কমছে চামড়ার দাম। গত দুই মাসে যেখানে লবণের দাম বেড়েছে একশ’ টাকা সেখানে চামড়ার দাম কমেছে সর্বনিম্ন ২০ টাকা।

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দেশের অন্যতম বৃহৎ চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাটে শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। তবে মৌসুমের চামড়া কেনার আগেই বেড়েছে চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপকরণ লবণের দাম। ফলে আসন্ন কোরবানির ঈদে চামড়া কেনাবেচায় উদ্বেগে রয়েছেন যশোরের রাজারহাটের ব্যবসায়ীরা। যদিও বাজার বিপণন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে কি না, তা নজরদারিতে রাখা হবে।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাট। এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ৩ শতাধিক চামড়ার আড়ৎ। সারা বছর চামড়া কেনাবেচা হলেও কোরবানির ঈদ ঘিরেই জমে ওঠে মৌসুমি বাণিজ্য। ঈদ মৌসুমে যশোর ছাড়াও খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, মাগুরাসহ আশেপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুল পরিমাণ চামড়া আসে এই মোকামে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এবার ঈদের আগেই চামড়া সংরক্ষণের প্রধান উপকরণ লবণের দাম বস্তাপ্রতি ১০০ টাকা বেড়েছে। রোজার ঈদের পর থেকেই ধীরে ধীরে লবণের দাম বাড়তে শুরু করে। যে লবণ এক মাস আগে বস্তা প্রতি ৭শ’ শেকে ৭শ’৫০ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন বেড়ে হাজার পঞ্চাশ টাকায় পৌঁছেছে।

রাজারহাট চামড়া মোকামের ব্যবসায়ী আব্দুল মাজেদ বলেন, একদিকে যেমন লবণের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে প্রতি হাটে চামড়ার বাজারদর কমছে। ফলে কোরবানির ঈদে সরকার চামড়ার যে দাম নির্ধারণ করে, সেই দামে কিনলেও প্রক্রিয়াজাত করার পর কম দামে বিক্রি করতে হয় তাদের। এতে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয় বলে জানান তিনি।

এই হাটের আরেক ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক জানান, স্থানীয় লবণ ব্যবসায়ীদের সিণ্ডিকেটের কারণে আড়ৎদারদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।

চামড়া ব্যবসায়ী গাজী মাসুদ বলেন, রোজার ঈদ পরবর্তী সময়ে এ মোকামে মোট ৮টি হাট বসেছে। যেখানে চামড়ার ফুট প্রতি দাম কমেছে ২০ টাকা করে। অন্যদিকে একটি চামড়া বাজারজাতের উপযোগী করতে লবণ ও শ্রমিক খরচ দিয়ে ৩শ’ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। এতে লাভের পরিবর্তে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।

অন্যদিকে লবণ আড়ৎদার ইমরান হাসান পাপ্পু বলছেন, বর্ষা মৌসুমে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লবনের দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি আরও জানান, সাধারণত এ হাটে লবণের চাহিদা থাকে ৭শ’ থেকে ৮শ’ বস্তা। তবে কোরবানির ঈদের পর চাহিদা বেড়ে ১ হাজার থেকে ১৫শ’ বস্তায় পৌঁছায়।

এদিকে অনেক ব্যবসায়ী বলছেন, গত কোরবানির মৌসুমে তারা ধার-দেনা করে চামড়া কিনে বাকিতে বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু এখনো ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে সেই অর্থের বড় অংশ পরিশোধ হয়নি। তাদের হিসাবে, শুধু যশোরের রাজারহাটের ব্যবসায়ীদের ট্যানারি মালিকদের কাছে পাওনা রয়েছে ১০ কোটি টাকা।

রাজারহাট চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে বাকিতে চামড়া বিক্রি করতে হয়। কিন্তু আগের বকেয়া টাকা এখনো পরিশোধ হয়নি।

চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি আব্দুল মালেক জানান, প্রতি বছরই ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়ার অর্থের বড় আংশ বকেয়া থেকে যায়। সেই টাকা পরের বছর ঈদের আগে তারা সাধারণত মোট পাওনার মাত্র ২৫ শতাংশ পরিশোধ করেন। এতে মূলধন সংকটে পড়তে হয় ব্যবসায়ীদের।

আরেক ব্যবসায়ী নাসির আহমেদ শেফার্ড বলেন, সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দেয়, বাস্তবে তার চেয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা। ট্যানারি মালিকরা নানা অজুহাতে সরকারি দামের চেয়ে কম দামে চামড়া কিনে থাকেন।

তবে যশোরের বাজার বিপণন কর্মকর্তা কিশোর সাহা বলেন, কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত দামে লবণ বিক্রি করছে কি না, তা নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

যশোরের রাজারহাটের চামড়া ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকার কোরবানির চামড়ার মূল্য নির্ধারণের পর যদি কার্যকরভাবে বাজার তদারকি করলে এবং ট্যানারিগুলোর সিণ্ডিকেটের মাধ্যমে ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ বন্ধ করতে পারলে, চামড়া ব্যবসায় স্থিতিশীলতা ফিরবে। একই সঙ্গে চামড়া সংরক্ষণে ব্যবহৃত উপকরণ লবণের বাজারও স্বাভাবিক থাকবে বলে তারা মনে করছেন।

 

Share.
Exit mobile version