সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে আসা এই ভাইরাসজনিত রোগটি আবারও নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এটি নিঃসন্দেহে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানে অনীহা, অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে না মানার প্রবণতাই এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা খুব সহজেই একজন থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে। একজন আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে আসা প্রায় ৯০ শতাংশ টিকাবিহীন শিশু এতে সংক্রমিত হতে পারে। সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি এবং চোখ লাল হওয়ার মাধ্যমে রোগটির প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেয়। পরবর্তীতে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা যায়, যা দ্রুত সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই এটি শুধু একটি সাধারণ অসুখে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সময়মতো চিকিৎসা না পেলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে, যা শিশুর জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনো অনেক অভিভাবক শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির গুরুত্ব পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছেন না। নানা ধরনের ভুল ধারণা, গুজব কিংবা অজ্ঞতার কারণে অনেকেই টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় ভোগেন। এর ফলে অনেক শিশু প্রয়োজনীয় টিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ আবারও সমাজে বিস্তার লাভ করছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা। প্রতিটি অভিভাবকের উচিত নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী তাদের সন্তানকে হাম ও রুবেলার টিকা প্রদান করা। টিকা শুধু একটি শিশুকে সুরক্ষা দেয় না, বরং এটি একটি সামষ্টিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যা সমাজের অন্যান্য শিশুদেরও নিরাপদ রাখে। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত আলাদা রাখা, তার সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে শিশুদের পুষ্টির দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার, বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’ শিশুর সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং বসবাসের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

সরকার ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পাশাপাশি গণমাধ্যমের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করা, সঠিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং গুজব প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে এই কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা গেলে সচেতনতার পরিধি আরও বিস্তৃত হবে।

সবশেষে বলা যায়, হাম কোনো অবহেলার রোগ নয়। এটি প্রতিরোধযোগ্য হলেও অবহেলার কারণে তা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। তাই এখনই সময় আমাদের সবার সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার। সচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান নিশ্চিতকরণ এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে আমরা সহজেই এই রোগের বিস্তার রোধ করতে পারি। একটি সুস্থ শিশু মানেই একটি সুস্থ জাতির ভিত্তি—এই উপলব্ধি থেকেই আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

Share.
Exit mobile version