বাংলার ভোর প্রতিবেদক

মৌসুমের শুরুতে তীব্র ডিজেল সংকটে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে চরম ভোগান্তি ও বাড়তি খরচের চাপে পড়েছিলেন যশোরের বোরো চাষিরা।

সময়মতো জমিতে পানি দিতে না পেরে অনিশ্চয়তায় পড়েছিল চাষাবাদ। তবে সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত, ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া এবং সরকারি প্রত্যয়নপত্র চালুর ফলে সেই সংকট অনেকটাই কেটে গেছে। ফলে জেলায় বোরো চাষে স্বস্তি এসেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত দুই দিনে যশোরে ২৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমের শুরুতেই এ বৃষ্টিপাত বোরো চাষের জন্য অত্যন্ত উপকারী হিসেবে দেখছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।

বৃষ্টির পানিতে জমিতে প্রাকৃতিকভাবে আর্দ্রতা বজায় থাকায় সেচের ওপর নির্ভরতা কমেছে। এতে কৃষকদের সেচ খরচ যেমন কমেছে, তেমনি জমিতে পানি ধরে রাখাও সহজ হয়েছে।

মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমের শুরুতে পরিস্থিতি ছিল বেশ কঠিন। যশোর সদর উপজেলার বাগেরহাট গ্রামের কৃষক বাতুল হোসেন বলেন, শুরুতে ডিজেলের এমন সংকট ছিল যে অনেক জায়গায় পাম্প চালানোই সম্ভব হচ্ছিল না। সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারিনি। এতে করে ধানের চারা ক্ষতির আশঙ্কা ছিল।

তিনি আরও জানান, সুযোগ বুঝে কিছু পাম্প মালিক পানির দাম বাড়িয়ে দেন, ফলে কৃষকদের খরচ বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে তিন থেকে চার দিন পর পর সেচ দিতে হয়েছে, যা বোরো চাষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একই এলাকার আরেক কৃষক তোরাব আলী বলেন, এখন পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো। নিয়মিত ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে, ফলে সেচ দিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তিনি জানান, বর্তমানে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প ব্যবহারের ফলে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমে এসেছে।

পাম্প ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, মৌসুমের শুরুতে তেলের তীব্র সংকট ছিল। অনেক সময় পাম্পে তেল না পেয়ে গ্রাম থেকে বেশি দামে কিনতে হয়েছে। প্রতি লিটার তেলে ১০০ থেকে ১১০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হয়েছে তাদের। তবে এখন পরিস্থিতির স্বাভাবিক হয়েছে করে তিনি বলেন, সরকারি প্রত্যয়নপত্র চালুর কারণে কৃষকেরা সহজেই তেল সংগ্রহ করতে পারছেন। পাশাপাশি বিদ্যুৎচালিত পাম্পের ব্যবহার বাড়ায় চাপও কমেছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে যশোর জেলায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। এ বিশাল আবাদ নির্বিঘ্ন রাখতে সেচ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে দেখা দেয়া সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হওয়ায় এখন উৎপাদন নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, মৌসুমের শুরুতেই যে বৃষ্টি হয়েছে, তা বোরো চাষের জন্য ইতিবাচক। এতে জমিতে প্রাকৃতিকভাবে পানি পাওয়া গেছে, ফলে সেচের চাপ কমেছে। তিনি আরও বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং সেচ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলে এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব।

তিনি জানান, শুরুতে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই অনুকূলে রয়েছে। বৃষ্টিপাত, ডিজেল সরবরাহের উন্নতি এবং বিদ্যুৎচালিত সেচ ব্যবস্থার বিস্তারের কারণে এবার বোরো ধানে ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে জেলা প্রশাসনও কৃষকদের সহায়তায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এ বিষয়ে যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান জানান, কৃষি উৎপাদন নির্বিঘ্ন রাখতে কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রত্যয়নপত্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই প্রত্যয়নপত্রের মাধ্যমে কৃষকেরা সহজে ডিজেল সংগ্রহ করতে পারছেন, যা সেচ কার্যক্রম সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে যশোরে এবার বোরো ধানে বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখছেন তারা।

Share.
Exit mobile version