বাংলার ভোর প্রতিবেদক
নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির আবেদনটি নিয়ে স্বজনরা বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের কাছে গেলেও ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়’ সেটি যশোরের জেলা প্রশাসকের কাছে পৌঁছায়নি। ভুল বোঝাবুঝির কারণে স্বজনরা ধরে নেন প্যারোলে মুক্তি হয়নি। তাই পরিবারের সদস্যরা সাদ্দামের মৃত স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে আসেন যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে। শনিবার সন্ধ্যারাতে জেলগেটেই মৃত স্ত্রী সন্তানকে শেষ বিদায় জানান যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দাম। স্ত্রী সন্তানের মৃত্যুর পরও সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি না দেয়ায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী ও নয়মাসের শিশুসন্তান নাজিফের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সাদ্দাম বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছেন। তিনি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলা সভাপতি।
কারাগার সূত্রে জানা গেছে, সব নিয়ম মেনে মরদেহ দুটি কারাফটকে আনা হলে সাদ্দামকে সেখানে নেয়া হয়। দীর্ঘ সময় পর স্ত্রীকে শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখেন এবং জীবনে প্রথমবারের মতো নিজের মৃত সন্তানকে কোলে তুলে নেন তিনি। এ সময় উপস্থিত কারারক্ষী ও স্বজনদের মধ্যে এক শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সাদ্দামের স্বজনদের অভিযোগ :
স্বজনদের দাবি, সাদ্দাম দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি থাকায় তার স্ত্রী স্বর্ণালী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। স্বামীর মুক্তির কোনো পথ না পেয়ে চরম হতাশা থেকে তিনি প্রথমে তার শিশুকে পানির বালতিতে চুবিয়ে হত্যা করেন এবং পরে নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। সাদ্দামের পরিবার জানায়, কারাবন্দি সাদ্দাম মাঝেমধ্যে স্ত্রীকে চিরকুট পাঠিয়ে ধৈর্য ধরতে বলতেন এবং দ্রুত মুক্ত হওয়ার আশ্বাস দিতেন। এসব বার্তা স্বর্ণালীর ওপর মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাদ্দামের ভাই শহিদুল ইসলাম জানান, ‘শুক্রবার যখন মরদেহ দুটি ঘর থেকে উদ্ধার হয়; তখন আমরা সিন্ধান্ত নেই সাদ্দামকে শেষ বারের মতো তার স্ত্রী ও সন্তানকে দেখানোর। এরপর আমাদের মামা হেমায়েত উদ্দিন তার এক সহকর্মীকে নিয়ে যান বাগেরহাটের ডিসি অফিসে। ছুটির দিন থাকাতে ডিসি স্যার না থাকায় চলে যান ডিসি বাংলোতে। সেখানে ডিসিকে সব খুলে বলার পর সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তির আবেদনপত্রটি দিয়ে দেই। এরপর আবেদনপত্রটির এক কপিও আমাদের দিয়ে দেয় বাংলোর এক কর্মকর্তা। সেখানে রিসিভ করার কোন স্বাক্ষর ছিলো না। স্বাক্ষর না থাকার বিষয়টি জানতে চাইলে বাংলোর কর্মকর্তা জানান কোন সমস্যা হবে না। বাংলো থেকে পরে জানানো হয়, প্যারোলে মুক্তি মেলেনি।
তিনি বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাগেরহাটের ডিসি বলেছে, তিনি (ডিসি) নাকি আমাদের বুঝিয়ে পাঠিয়ে দেয়। একই সাথে যশোরের ডিসি ও কারা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে। তিনি এই ধরণের কোন কথাই বলেননি। তিনি এই পরামর্শটা দিলেও আমরা যশোরে যোগাযোগ করতাম। শেষমেষ আমরা নিজেরাই জেলারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। পরে কারাফটকে কয়েক মিনিটের জন্য ভাইকে তার সন্তান ও স্ত্রীকে দেখতে দিলো। তিনি বলেন, আমরা তো এসব প্রক্রিয়া বুঝি না। আমলাদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এই পরিণত হয়েছে।’
সাদ্দামের মামা মো. হেমায়েত উদ্দিন জানান, ‘গত ২৩ জানুয়ারি বাগেরহাট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর প্যারোলে মুক্তির জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়। জেলা প্রশাসক তাকে বাগেরহাট জেলা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠান। সেখানে জানানো হয়, প্যারোলে মুক্তি দেয়ার কোনো এখতিয়ার তাদের নেই। আইন অনুযায়ী যেই কারাগারে আসামি বন্দি আছেন, সেখানেই আবেদন করতে পরামর্শ দেয়া হয়। পরে আর কোনো উপায় না পেয়ে যশোর কারাগারে মরদেহ নিয়ে গেলে মাত্র তিন মিনিটের জন্য দেখার সুযোগ দেয়া হয়।’
সুবর্ণার ভাই মো. শুভ বলেন, স্বামী কারাবন্দি থাকায় অনেকটাই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন তার বোন। মানসিকভাবে অনেকটাই ভেঙে পড়েছিলেন। তবে অন্য কিছুও থাকতে পারে। তিনি প্রশাসনের কাছে ঘটনা তদন্তের দাবি জানান।
তিনি আরও বলেন, ‘ছেলেটারে আমার দুলাভাই একবারও কোলে নিতে পারেনি। শেষবারের জন্য যেন একটু দেখতে পারে, তাই নিয়ে (কারাফটকে) গিয়েছিলাম।’
বাগেরহাট ও যশোর জেলা প্রশাসকের দাবি ভিন্ন :
স্ত্রী-সন্তানের জানাজায় আসতে জুয়েলকে প্যারোলে মুক্তি না দেয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘প্যারোলের একটি আবেদন নিয়ে আসছিল। তাদের বুঝিয়ে বলা হয়েছে। যেহেতু সে আছে যশোরের কারাগারে, আবেদন করতে হবে সেখানকার (যশোরের) জেলা প্রশাসক বা জেল সুপারের কাছে। এখানকার (বাগেরহাটের) প্রশাসন তাদের বিষয়ে যশোর জেলা কারাগারেও বলে দিয়েছিল। কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলেছিল, যেন সুন্দরভাবে, সঠিকভাবে তাদের মৃত স্বজনের লাশ দেখতে পারে। আমরা তাদের সেখানে যাওয়া এবং দেখার বিষয়ে সহযোগিতা করেছি।’
এদিকে, জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির আবেদন সংক্রান্ত সংবাদে ভিন্নমত প্রকাশ করেছে যশোর জেলা প্রশাসন। রোববার জেলা প্রশাসকের মিডিয়া সেলের সহকারী কমিশনার আশীষ কুমার দাস স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্যারলে মুক্তির আবেদন বিষয়ে ব্যাখা করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রোববার যশোর জেলা প্রশাসনের মিডিয়া সেলের সহকারী কমিশনার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ‘বাগেরহাট কারাগার থেকে গত ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আগত বন্দি জুয়েল হাসান সাদ্দাম নামক ব্যক্তির স্ত্রী ও সন্তান মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, যশোর কিংবা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ বরাবর প্যারোলে মুক্তির কোনো ধরনের আবেদন করা হয়নি। বরং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পরিবারের বক্তব্য থেকে জানা যায়, সময় স্বল্পতার কারণে তাদের পারিবারিক সিদ্ধান্তে প্যারোলে মুক্তির আবেদন না করে জেল গেটে লাশ দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্টে উলি¬খিত বন্দির স্ত্রীকে লিখিত চিঠি, কারাগারে বন্দি অবস্থায় ছবি দেখা যাচ্ছে যা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের সাথে সংশি¬ষ্ট নয়। এছাড়া আবেদনের পরেও প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়নি, এ ধরনের তথ্যও মিথ্যা; কারণ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, যশোর বরাবর প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত কোনো আবেদনই করা হয়নি। বরং পরিবারের মৌখিক আবেদনের প্রেক্ষিতে কারা কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে মানবিক দিক বিবেচনায় কারা ফটকে লাশ দেখানোর ব্যবস্থা করে।’
আইনের ব্যাখা কি ?
এ বিষয়ে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহম্মেদ জানান, নিয়ম অনুযায়ী বন্দি যে কারাগারে আছে, সেই জেলার জেলা প্রশাসকের কাছে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করতে হবে। আমার জানামতে যশোরের জেলা প্রশাসক ও আমাদের কাছে সাদ্দামের স্বজনরা কোন আবেদন করেনি। তবে স্বজনেরা মুঠোফোনে আমাকে জানিয়েছিলো। তাদের বলেছিলাম, প্যারোলে জামিন না হলে কারাফটকে কিছুক্ষণের জন্য দেখা করার সুযোগ রয়েছে। সাধারণত যেকোন বন্দির স্বজন মারা গেলে; কারাফটকে আসলে মানবিক দিক বিবেচনা করে মরদেহ দেখিয়ে দেই।’
যশোর জজ কোর্টের অ্যাডভোকেট আমিনুর রহমান হিরু বলেন, কারাগারে আটক থাকাকালীন কোন বন্দির নিকটাত্মীয় স্বজন মারা গেলে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে আবেদন করে প্যারোলে মুক্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু যশোরে কারাগারে যা ঘটে গেল সেটা আইনগতভাবে বন্দির অধিকার লংঘন করেছে কর্তৃপক্ষ। এটা নিঃসন্দেহ অন্যায় হয়েছে।
এ বিষয়ে যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাড. সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, প্যারোলে মুক্তির জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করতে হয়। খোঁজ নিয়ে জেনেছি বন্দির স্বজনরা আবেদনই করেনি। তাহলে তিনি
কিভাবে মুক্তি পাবেন ?
এদিকে জানাজার নামাজ শেষে বাগেরহাটে পারিবারিক কবরস্থানে গৃহবধূ কানিজ সুবর্ণা ওরফে স্বর্ণালী (২২) ও তার ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তানের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার রাত ১২টার দিকে সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে কানিজের বাবার বাড়ির কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয় মা-ছেলেকে। এর আগে স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে রাত ১১টা ২০ মিনিটে তাদের জানাজা হয়। গত শুক্রবার দুপুরে সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে কানিজের স্বামীর বাড়ি থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ এবং ৯ মাস বয়সী ছেলে সেজাদ হাসান নাজিফের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।

