বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
কাগজে-কলমে প্রকল্প শেষ হয়েছে তিন বছর আগে। ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৭৯ কোটি টাকা। নদীর তলদেশ পুনঃখনন, ড্রেজিং, তীর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও শেষ হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যশোরের ঐতিহ্যবাহী ভৈরব নদ এখনো অনেক স্থানে স্থির পানির জলাধারে পরিণত। কোথাও কচুরিপানার বিস্তীর্ণ আস্তরণ, কোথাও কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি। নদীর স্বাভাবিক স্রোত না ফেরায় প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

সরেজমিনে যশোর শহরের দড়াটানা, নিমতলা, দাইতলা, রূপদিয়া হয়ে রাজারহাট পর্যন্ত নদীপথ ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ স্থানে পানির প্রবাহ নেই। কচুরিপানা নদীর বড় অংশ দখল করে আছে। কোথাও নদীর বুকে মাছ চাষ করা হচ্ছে, যা কার্যত স্থির পানির উপস্থিতিরই প্রমাণ। অনেক স্থানে পানির রং কালচে হয়ে গেছে এবং তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

লক্ষ্য ছিল নদী পুনর্জীবন, বাস্তবে মেলেনি প্রত্যাশা
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১ জুলাই ‘ভৈরব রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প’ শুরু হয়। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৭২ কোটি ৮১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা এবং মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। পরে ব্যয় ও সময় বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ৩০ জুন প্রকল্প শেষ করা হয়। সব মিলিয়ে ব্যয় দাঁড়ায় ২৭৯ কোটি ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল ভৈরব নদে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, দর্শনার মাথাভাঙ্গা নদীর সঙ্গে সংযোগ পুনঃস্থাপন, নৌ-চলাচল চালু করা, জলাবদ্ধতা দূর করা, সেচ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নদীকেন্দ্রিক মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি। এর মাধ্যমে যশোর সদর, চৌগাছা, বাঘারপাড়া ও অভয়নগর উপজেলার প্রায় ২২ হাজার হেক্টর এলাকার পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

পাউবোর দাবি, বসুন্দিয়া থেকে চৌগাছার তাহেরপুর পর্যন্ত ৯২ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন এবং বসুন্দিয়া থেকে আফ্রা ঘাট পর্যন্ত চার কিলোমিটার ড্রেজিং করা হয়েছে। এছাড়া যশোর শহরের ভৈরব তীরের ২০০ মিটার এলাকায় প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও সম্পন্ন হয়েছে।

খনন হয়েছে, কিন্তু মাঝখানের চ্যানেল রয়ে গেছে ভরাট
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুনঃখননের সময় নদীর মূল চ্যানেল এবং বিভিন্ন সেতুর নিচের অংশ যথাযথভাবে খনন করা হয়নি। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ তৈরি হয়নি।

বারান্দিপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী রসুল মিয়া বলেন, নদীর মাঝখান ঠিকভাবে কাটা হয়নি। দুই পাশ খনন করলেও মূল চ্যানেল উঁচু থাকায় পানি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এত টাকা খরচ করেও নদীর অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি।”

‘মূল সমস্যাই রয়ে গেছে অমীমাংসিত’
ভৈরব বাঁচাও আন্দোলন কমিটির নেতা জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, আন্দোলনের দাবির পরই সরকার প্রায় ২৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নে বড় ধরনের ত্রুটি ছিল। তার ভাষায়, নদীর দুই পাশ খনন করা হলেও মাঝখানের মূল চ্যানেল অনেক জায়গায় উঁচু রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় ভুল ছিল উজানে মাথাভাঙ্গা নদীর সঙ্গে ভৈরবের সংযোগ পুনঃস্থাপন না করা। স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত না করে শুধু খনন করলে নদী কখনো জীবিত হবে না।”

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল। সংকীর্ণ সেতু ও কালভার্ট নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। পুনঃখনন ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হলেও পরবর্তী ধাপের কাজ আর বাস্তবায়ন হয়নি। পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় না রেখে খনন করায় প্রকল্পের কাঙ্খিত সুফল আসেনি।

দূষণে আরও সংকটাপন্ন ভৈরব
শুধু প্রবাহ সংকট নয়, দূষণও এখন ভৈরবের বড় সমস্যা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নদীর তীরবর্তী কয়েকটি ক্লিনিক ও হাসপাতালের মেডিকেল বর্জ্য এবং আশপাশের ভবনের পয়ঃবর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে পানি কালো হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। প্রবাহ না থাকায় দূষণকারী উপাদান নদীতেই জমে থেকে পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

দায় স্বীকার পাউবোর, সমাধান অন্য সংস্থার হাতে
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত কিছু সেতু ও কালভার্টের কারণে নদীতে আবার পলি জমছে এবং নাব্যতা কমছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে একাধিকবার চিঠি দেয়া হলেও এখনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যশোর শহরের দড়াটানা থেকে চৌগাছার তাহেরপুর পর্যন্ত প্রায় ৫৭ কিলোমিটার নদীপথ ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারাবে। এর ফলে জলাবদ্ধতা, নাব্যতা সংকট ও পরিবেশগত বিপর্যয় আরও বাড়বে।

এলজিইডির দাবি, নতুন সেতুর উদ্যোগ চলছে
এ বিষয়ে এলজিইডি যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুবুর রহমান বলেন, নদীর ওপর শুধু এলজিইডি নয়, সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ বিভিন্ন সংস্থার সেতু রয়েছে। বসুন্দিয়া সেতু পুনর্নিমাণের টেণ্ডার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আরও তিনটি সেতুকে নতুন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি নদীর ওপর থাকা অন্যান্য অবকাঠামোও জরিপ করে প্রয়োজনীয় ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স নিশ্চিত করে নতুন নকশা তৈরির কাজ চলছে।

প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে ?
প্রকল্প শেষ হয়েছে তিন বছর আগে। ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৭৯ কোটি টাকা। কিন্তু নদীতে ফিরেনি কাঙ্খিত স্রোত, চালু হয়নি নৌ-চলাচল, দূর হয়নি দূষণ কিংবা কচুরিপানার দখল। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো একে অপরের দিকে দায় ঠেলে দিলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই-যে প্রকল্পের মূল লক্ষ্যই ছিল ভৈরবকে পুনর্জীবিত করা, সেই নদী যদি আজও স্থবির থাকে, তাহলে শতকোটি টাকার প্রকল্পের সফলতা কোথায়?

Share.
Exit mobile version