বাংলার ভোর প্রতিবেদক
শীতের বিকাল। মিষ্টি রোদ্দুর। বোরো ধান আবাদের জন্য মাঠ প্রস্তুত করে রেখেছেন চাষি কৃষক। সেই মাঠে হয়ে গেল গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী গরুর গাড়ির দৌঁড় প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতা দেখতে ঢল নেমেছিলো নানা বয়সী মানুষের। শুক্রবার বিকেলে যশোর সদর উপজেলার পাঁচবাড়িয়া গ্রামে এই ঐতিহ্যবাহী গরুর গাড়ি দৌঁড় প্রতিযোগিতা আয়োজন করে গ্রামবাসী।
আয়োজকরা জানান, এই গ্রামে অন্তত দুই যুগ ধরে ঐতিহ্যবাহী এই গরুর গাড়ির দৌঁড় প্রতিযোগিতা হয়ে আসছে। কয়েক হাজার দর্শক মাঠে উপস্থিত থেকে উপভোগ করেন এই খেলা। গরু গাড়ির দৌঁড় প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে সেখানে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ। এ উপলক্ষে বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে বসে গ্রামীণ মেলা। গ্রামীণ এই মেলাকে কেন্দ্র করে এই সময়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি উৎসবের আমেজ বয়ে যাচ্ছে। মেলা উপলক্ষে মেয়ে-জামাই বাড়িতে এসেছে। গরুর গাড়ি দৌঁড় প্রতিযোগিতার মাঠে মেলার পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি শীতের পিঠাপুলির ধুম পড়ে। বিলুপ্ত প্রায় এই খেলা দেখে আনন্দিত আগত হাজার হাজার দর্শক।
মেলা প্রাঙ্গণ থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বের গ্রাম এনায়েতপুর। এই গ্রাম থেকে ষাটোর্ধ্ব মোহাম্মদ ইবাদ আলী তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেলায় আসেন। ইবাদ আলী বলেন, ‘এই মেলা উপলক্ষে মেয়ে-জামাই বাড়িতে এসেছে। মেয়ে-জামাই নাতি পোতা, ছেলে, বেটার বউ-সবাইকে নিয়ে এই মেলায় এসেছি। গরু দাবড় দেখলাম। খুব আনন্দ লাগলো’।
মেলা প্রাঙ্গণের আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গ্রামীণ মেলা বসেছে। এই মেলায় বড় ছাতা মেরে শিশুদের খেলনা, পিয়াজু-পাপড়-ভাজাসহ হরেক রকম পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। একই সাথে শিশুদের বিনোদনের জন্য জাম্পিং ডবল, ঘুরলি ঘোড়া, বক্সিং ওয়েট, ছোট নাগরদোলা ও বড় নাগরদোলা নিয়ে এসেছে উদ্যোক্তারা। বাঘারপাড়া উপজেলার সুবোধ দেবনাথ দুপুরের পরে মেলায় শিশুদের খেলনার দোকান নিয়ে বসেন। কয়েক ঘন্টায় প্রায়ই এক হাজার টাকা বিক্রি করেন তিনি।
সুবোধ দেবনাথ বলেন, ‘গরুর গাড়ির গাড়োয়ানদের মাধ্যমে মেলার খোঁজ পাই। ১৫-১৬ বছর ধরে এই মেলায় দোকান দিতে আসি। বেচাকেনা ভালো হয়’। ঝিনাইদহ থেকে নাগরদোলা নিয়ে এসেছেন সুমন কুমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, এই মেলায় এই প্রথম এলাম। ভগ্নিপতির বাড়ি এখানে। আল্লাহ দিলে অনেক টাকাই হবে। তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে মেলায় আসা সাথী খাতুন বলেন, দুই ছেলেকে নাগরদোলায় চড়িয়েছি। অনেক বছর ধরে এখানে মেলা হচ্ছে। ছেলে মেয়েরা খুব উপভোগ করে’।
প্রতিযোগিতায় ২৫ দল অংশ নিয়েছিলো। এতে যশোর সদর উপজেলার রহিমপুর গ্রামের আশরাফুল ইসলাম প্রথম, লেবুতলা গ্রামের সবেদ আলী দ্বিতীয় ও নলডাঙ্গা গ্রামের এনামুল তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। প্রথম পুরস্কার হিসেবে সোনার কানের দুল, দ্বিতীয় পুরস্কার হাতের আংটি আর তৃতীয় পুরস্কার হিসেবে দেয়া হয়েছে বাইসাইকেল। পাঁচবাড়িয়া গ্রামবাসীর ব্যানারে আয়োজনে এই প্রতিযোগিতার প্রধান অতিথি ছিলেন যশোর সদর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম।
সভাপতিত্ব করেন নোয়াপাড়া ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ফারুক হোসেন। আয়োজক কমিটির সদস্য জাহিদ হাসান বলেন, দুই যুগের বেশি সময় ধরে এই গ্রামে ঐতিহ্যবাহী এই গরুর গাড়ির দৌঁড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য প্রয়াত কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

