বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তে যশোরে ক্ষোভ, উদ্বেগ ও হতাশা দেখা
দিয়েছে। পরিবহণশ্রমিক থেকে শুরু করে কৃষক, ব্যবসায়ী চাকরিজীবী ও সীমিত আয়ের মানুষের
আশঙ্কা, তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু যানবাহনের জ্বালানি খরচেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, ধাপে
ধাপে এর প্রভাব পড়বে কৃষি উৎপাদন, পণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিত্যপণ্যের বাজারে।
এতে বাড়বে জীবনযাত্রার ব্যয়, কমবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। বিশেষ করে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের
মানুষকে সবচেয়ে বেশি চাপ সামলাতে হবে বলে মনে করছেন,অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবাদী,
ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতারা।
গত সোমবার থেকে সবধরনের তেলের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। এতে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫
টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা
এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। চলতি বছরে এর আগে কয়েক দফায় জ্বালানি তেলের
দাম বাড়ানো হয়েছিল।
এই মূল্য বৃদ্ধির পর যশোরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের
প্রধান উদ্বেগ এখন বাড়তি ব্যয়। পরিবহন খাতে জ্বালানি খরচ বাড়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের
ব্যয়, কৃষিতে সেচ ও যন্ত্র পরিচালনার খরচ এবং ব্যবসায় পণ্য আনা-নেওয়ার ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা
করছেন তারা। এর সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে একই আয়ে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে
পড়বে বলে জানিয়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ।
এক জায়গায় আঘাত করলে সব জায়গায় ঢেউ লাগে :
পরিবেশবাদী ও যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ছোলজার রহমান বলেন,
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব কোনো একটি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব
অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে কয়েক দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ এক লাফে
লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এতে শুধু ব্যক্তিগত বা গণপরিবহনের খরচ নয়, পণ্য
উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহের প্রতিটি ধাপে ব্যয় বাড়বে।
ছোলজার রহমান আরও বলেন, একটি পরিবারের মাসে অসংখ্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হয়। এসব পণ্যের
উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত কোথাও না কোথাও জ্বালানি ব্যয় রয়েছে।
তেলের দাম বাড়ার পর ব্যবসায়ীরা পরিবহন, উৎপাদন বা সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে
পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ পাবেন।
তাঁর ভাষায়, এমন জায়গায় আঘাত দেওয়া হয়েছে, যেখানে আঘাত করলে সব জায়গায় ঢেউ লাগে।

তিনি বলেন, এর ফলে একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
নির্ধারিত আয়ের মানুষের আয় একই থাকলে সেই বাড়তি ব্যয় সামলাতে তাদের সঞ্চয় কমাতে হবে
কিংবা প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দিতে হবে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে যশোরের কৃষকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জেলার কৃষিতে সেচ,
জমি প্রস্তুত, কৃষিযন্ত্র পরিচালনা ও কৃষিপণ্য পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। সামনে
বোরো মৌসুম হওয়ায় ডিজেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে আরও বেশি শঙ্কা রয়েছে।
বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির যশোর জেলা সাধারণ সম্পাদক তসলিম উর রহমান বলেন, জ্বালানি তেল সামগ্রিক
অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এর দাম বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ে।
তিনি বলেন, সামনে ইরি-বোরো মৌসুম। ধান উৎপাদনে সেচের জন্য ডিজেলের প্রয়োজন হবে। ফলে
ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যয়ের সঙ্গে
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য খাতের ব্যয়ও সম্পর্কিত।
তসলিম উর রহমান বলেন, এক লাফে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে। এর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে নিম্ন
আয়ের মানুষের ওপর।
তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের দেয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন মিডিয়ায়
প্রকাশ করা হয়েছে যে, ভারতে পাচার রোধ করার জন্য তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটা যদি
সত্যি হয় তাহলে, এটা খুবই আপত্তিজনক। কারণ সীমান্তে নিয়োজিত যে সকল বাহিনী রয়েছে এই
বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তাদেরকে অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, যে সময় দেশের তেলের বাজারে দাম বৃদ্ধি করা হলো, সেই সময় বিশ্ব বাজারে
তেলের দাম কমতির দিকে। মধ্যপ্রচ্যের যুদ্ধের কারণে সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই সময় বৃদ্ধি
পাওয়াটা যৌতিক ছিল কিন্তু এখন পাইপলাইন একেবারে সচল। সে সময় এক লাফে তেলের দাম ২০
টাকা বৃদ্ধি মানে দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার মত সিদ্ধান্ত।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। যশোর শহর ও জেলার বিভিন্ন রুটে
চলাচলকারী বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী যান ও অন্যান্য ডিজেলচালিত যানবাহনের পরিচালন ব্যয়
বেড়েছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি খরচ বাড়লে আগের ব্যয়ে গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। এর
প্রভাব গণপরিবহনের ভাড়া ও পণ্য পরিবহনের খরচে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহনের ব্যয় বাড়লে যশোরের বাজারে বাইরের জেলা থেকে পণ্য
আনার খরচ বাড়বে। একইভাবে যশোর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সবজি, মাছ, ধানসহ কৃষিপণ্য
পাঠাতেও বাড়তি ব্যয় হবে। এর ফলে পণ্যের দাম বাড়ার একটি নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলে
মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
যশোরের ব্যবসায়ী মহলের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ব্যবসা-বাণিজ্যের
জন্য বড় ধরনের চাপ। গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ার মধ্যেই জ্বালানি তেলের
দাম বাড়ায় উৎপাদন ও পরিবহন খরচ আরও বাড়বে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোনো পণ্য উৎপাদন বা আমদানি করার পর সেটি দোকান বা বাজারে পৌঁছানো
পর্যন্ত একাধিকবার পরিবহন করতে হয়। প্রতিটি পর্যায়ে জ্বালানি খরচ রয়েছে। ফলে তেলের দাম
বাড়ার প্রভাব একটি পণ্যের পুরো সরবরাহব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তাদের আশঙ্কা, ব্যবসায়ীদের বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হবে। এতে
ভোক্তার ওপরই পড়বে সবচেয়ে বড় চাপ।
যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক
ইসরারুল হক বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
এর কারণে বিভিন্ন খাতের ব্যয় বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়বে।
তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের পরিবার, কৃষক, পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সীমিত আয়ের
মধ্যবিত্তরা তুলনামূলক বেশি চাপে পড়বেন।
তাঁর মতে, তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে অন্যান্য পণ্যের দাম যেন অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে, সরকারকে
সেটি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
তেলের দাম বাড়ার পর যশোরের সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে নিত্যপণ্যের
দাম নিয়ে। তাদের আশঙ্কা, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার অজুহাতে বাজারে আবারও চাল,
ডাল, সবজি, মাছসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
ফুড ডেলিভারি কর্মী সবুজ হোসেন বলেন, দিনে প্রায় এক হাজার টাকা আয় করে কোনোভাবে
সংসার চালান তিনি। কিন্তু তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়ছে। ফলে
আগের আয় দিয়ে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, নিজের যাতায়াত ও কাজের খরচ বাড়ার পাশাপাশি বাজারের খরচও বাড়ছে। কিন্তু আয়
বাড়ছে না। ফলে মাস শেষে হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
কর্মজীবী বাবু বলেন, এমনিতেই বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বেশি। এর মধ্যে হঠাৎ করে জ্বালানি
তেলের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন ভাড়া ও পণ্যের দাম যদি আবার বাড়ে, তাহলে সীমিত
আয়ের মানুষের সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে যাবে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর যশোরের নাগরিকদের একটি বড় অংশের দাবি, এই সুযোগে কেউ যেন
অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়াতে না পারে। তাদের মতে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিক প্রভাব
বাজারে পড়তে পারে। কিন্তু সেই সুযোগে কোনো পণ্যের দাম কয়েকগুণ বাড়ানো হলে তা
নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিবহন ভাড়া যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ, বাজার তদারকি এবং দরিদ্র পরিবার, কৃষক ও ক্ষুদ্র
উদ্যোক্তাদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির ওপর কর ও
অন্যান্য ব্যয় পর্যালোচনার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর
ইসরারুল হক বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সময় দেশের মূল্যস্ফীতিও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
গত আগস্টের শেষে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে কয়েক দফায়
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। একই সময়
অকটেন ১৪০, পেট্রল ১৩৫ এবং কেরোসিনের দাম ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর ৩১ মে
অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম আরও পাঁচ টাকা করে বাড়ানো হয়।
সর্বশেষ ২১ সেপ্টেম্বর থেকে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি আরও ২০ টাকা বাড়ানো
হয়েছে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে দাম বাড়ানোর পেছনে ভর্তুকির চাপ কমানোসহ বিভিন্ন যুক্তি দেওয়া হয়েছে। কম
দামের সুযোগ নিয়ে জ্বালানি তেল পাচারের আশঙ্কার কথাও আলোচনায় এসেছে। তবে যশোরের
কয়েকজন নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতা মনে করেন, এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলায় সীমান্ত
ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
যশোরে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বক্তব্যে
সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি তাই শুধু পেট্রলপাম্পের দামের বিষয় নয়,
, বাজার থেকে ভোক্তার রান্নাঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে পরিবহন ব্যবস্থা, সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব
পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই সেই ব্যয় বহন করতে হবে বলে মনে করছেন
সংশ্লিষ্টরা।
