কামরুজ্জামান টিটু
যশোর শহরের সড়কগুলোতে অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের অনিয়ন্ত্রিত দাপটে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। সড়কজুড়ে অদক্ষ, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অনভিজ্ঞ চালকদের বেপরোয়া চলাচলের কারণে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনা। হতাহতের পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের মালিকেরা। পর্যাপ্ত ট্রাফিক জ্ঞান, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও যানবাহনের যান্ত্রিক রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় শহরের প্রধান প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে পর্যন্ত তীব্র যানজট এখন নিত্যদিনের চিত্র।
স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও যাত্রীদের অভিযোগ, শহরে প্রয়োজনের তুলনায় ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কের বিভিন্ন অংশে যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক চালক যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা করান, সড়কের মাঝখানে গাড়ি থামান এবং প্রতিযোগিতা করে চলেন। ফলে ব্যস্ত সড়কে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা।
মূল শহরের বাইরের চালকদের ভিড় ও অনিয়ম
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু যশোর পৌর এলাকা নয়; বরং সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন, সীমান্তবর্তী এলাকা এমনকি পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকেও প্রতিদিন বহু চালক রিকশা বা ইজিবাইক নিয়ে শহরে প্রবেশ করছেন। কোনো প্রকার জাতীয় পরিচয়পত্র বা সঠিক নিবন্ধনের যাচাই ছাড়াই গ্যারেজ মালিক ও পুরনো বিশ্বস্ত চালকদের মধ্যস্থতায় অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের হাতে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা তুলে দেয়া হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, এসব চালকদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে মাদকাসক্তি, উগ্র আচরণ, এমনকি ভ্রাম্যমাণ ভিত্তিতে মাদক পরিবহন ও জুয়াড়িসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
যেখানে-সেখানে গড়ে উঠছে কারখানা ও চার্জিং পয়েন্ট
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, যশোর পৌর এলাকা ও সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক তৈরির পাশাপাশি মেরামত ও চার্জিংয়ের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
প্রতি রাতে নির্দিষ্ট ভাড়ার বিনিময়ে এসব স্থানে গাড়ি রেখে ব্যাটারি চার্জ করা হয়। একটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় দিনে গড়ে দুবার চার্জ দিতে প্রায় ২ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হয়। যশোর অঞ্চলে প্রতিনিয়ত চলাচলকারী হাজার হাজার যানবাহনের ব্যাটারি চার্জে সামগ্রিকভাবে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের ব্যবহার হচ্ছে, যা জাতীয় গ্রিডে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ করে শহরের খাজুরা বাসস্ট্যান্ড, জেলরোড এলাকায় সোহাগ অটো, ইসলাম অটোসহ বিভিন্ন নামে গড়ে উঠেছে অবৈধ অটোরিকশা তৈরির কারখানা। তেমনিভাবে শহরের বেজপাড়া কবরস্থান এলাকা, আর এন রোড, বারান্দিপাড়া, মুজিবসড়ক উপশহরের বি ব্লক বাজার, শহরতলীর বাহাদুরপুর, বিরামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অবেধ চার্জিং পয়েন্ট।
ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বাড়তি চাপ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার ওপরও প্রভাব ফেলছে বলে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করেন। তবে এসব চার্জিং পয়েন্টের বৈধ সংযোগ, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ এবং অনুমোদনের বিষয়টি পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ওজোপাডিকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী জি এম মাহমুদ প্রধান বলেন, “চোরাইভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়। আমাদের টহল টিম রয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই টহল দেয়া হয়। কেউ চোরাই লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে ধরা পড়লে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়।”
কারখানা নিয়ন্ত্রণে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি নিয়মকানুন ও অনুমোদনের বিষয়টি যথাযথভাবে না মেনে কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক তৈরি ও বাজারজাত করছে। এসব যানবাহনের নিবন্ধন, চলাচলের অনুমোদন, রুট ব্যবস্থাপনা এবং কারখানাগুলোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও কার্যকর তদারকি চোখে পড়ে না বলে অভিযোগ তাদের।
ফলে প্রতিদিন নতুন নতুন যানবাহন সড়কে যুক্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে পুরোনো যানবাহনও চলাচল করায় শহরের সড়ক ব্যবস্থাপনায় বাড়ছে চাপ।
চালকদের আচরণ নিয়েও অভিযোগ
শহরের জেলখানা রোডের বাসিন্দা হাজী ইউসুফ আলী বলেন, “শহরে প্রয়োজনের তুলনায় রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা বেড়েছে। অনেক চালকের আচরণও সন্তোষজনক নয়। সামান্য বিষয় নিয়েও কেউ কেউ পথচারী কিংবা অন্য চালকের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন।”
তার মতে, চালকদের প্রশিক্ষণের আওতায় এনে সড়ক আইন ও নিরাপদে গাড়ি চালানোর বিষয়ে ধারণা দেওয়ার পর যানবাহন চালানোর সুযোগ দেয়া উচিত।
দড়াটানা এলাকার ওষুধ ব্যবসায়ী বিনোদ সাহা বলেন, “আমার দোকানের সামনে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ইজিবাইক দাঁড়িয়ে থাকে। এতে ব্যবসা ও পথচারীদের চলাচলে সমস্যা হয়। তাদের কিছু বলতে গেলে অনেক সময় কয়েকজন একসঙ্গে এসে মারমুখি আচরণ করেন। প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।”
রবীন্দ্রনাথ সড়কের ব্যবসায়ী আবিদ রায়হান বলেন, “প্রায়ই সড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে। কখনো দুই চালকের মধ্যে বিরোধ হচ্ছে, আবার কখনো যাত্রীদের সঙ্গেও চালকদের বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটছে।”
দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি, আহত যাত্রী
একটি ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, সহকর্মীর মোটরসাইকেলে করে খাজুরা বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাওয়ার সময় একটি রিকশা তাদের মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়। এতে তার সহকর্মী কিশোর বাড়ৈ আহত হন এবং মোটরসাইকেলের লাইট ও ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শফিকুল ইসলামের দাবি, ওই রিকশাচালক অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় এবং পরে ক্ষমা চাওয়ায় তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। তবে এ ঘটনার কোনো মামলা বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
যশোর পৌরসভার লাইসেন্স বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শহরের অবৈধ যানবাহন ও অদক্ষ চালকদের দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনিক উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা পেলে অভিযান বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিদ্যুৎ চোরাচালান ও অপচয়ের বিষয়ে ওজোপাডিকো বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী জি এম মাহমুদ জানান, “অবৈধভাবে বা চুরি করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ নেই। আমাদের বিশেষ টহল টিম প্রতিদিন মাঠে সক্রিয় রয়েছে। এরপরও যদি কোথাও চোরাই লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রমাণ মেলে, তবে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”
যশোর জেলা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান জানান, “সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যশোর শহরকে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের অনিয়ন্ত্রিত যানজট থেকে মুক্ত করা সম্ভব।”
নগরবাসীর দাবি, শুধু সড়কে অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা, বৈধতা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও বয়স, কারখানা ও চার্জিং পয়েন্টের অনুমোদন এবং নির্দিষ্ট রুট ব্যবস্থাপনা-সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন। তা না হলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকা এসব যানবাহন একদিকে যেমন নগরীর যানজট আরও বাড়াবে, অন্যদিকে সড়ক নিরাপত্তার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
