ইমরান হোসেন পিংকু
এক যুগের বেশি সময়ে যশোর জেলা থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় ১৫ হাজার পুকুর বা জলাশয়। জনবসতি বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের চাপে একের পর এক পুকুর, দীঘি ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে যশোর শহরের ভেতরে হারিয়ে গেছে একসময়কার অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী জলাশয়। কোনোটি ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন, কোনোটি পরিণত হয়েছে বসতভিটায়; আবার কোথাও প্লট তৈরি করে চলছে বিক্রি। এতে একদিকে যেমন শহরের সবুজ ও জলাধার কমে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্রুত পানি পাওয়ার পথও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর যশোর কার্যালয়ের তথ্য বলছে, একসময় জেলায় পুকুর বা জলাশয় ছিল ৫৩ হাজার ৯৪২টি। বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ১২৯টিতে। অর্থাৎ এক যুগের ব্যবধানে জেলার ১৪ হাজার ৮১৩টি পুকুর ও জলাশয়ের অস্তিত্ব বিলিন হয়ে গেছে। হিসাব অনুযায়ী, গড়ে প্রতিবছর এক হাজারের বেশি পুকুর বা জলাশয় কমেছে।
জনসংখ্যার চাপ ও অপরিকল্পিতভাবে শহর সম্প্রসারণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে এসব প্রাকৃতিক জলাধার।
পুকুর হারিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে দৃশ্যমান চিত্র যশোর শহরে। গত এক থেকে দেড় দশকে শহরের প্রধান ডাকঘরের সামনের পুকুর, রেলগেটের চোরমারা দীঘি, নিরালা সিনেমা হলের পাশের পুকুর, বেজপাড়ার শ্রীধর পুকুর, আরবপুরের বড় পুকুর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন সড়কে ইসমাইল ডাক্তারের বাড়ির পেছনের বড় দীঘি, ইসলামিয়া স্কুলের পুকুর, পুরাতন কসবা আবু তালেব সড়কের পুকুর, ডাক্তার মোজাম্মেল হোসেনের পুকুর, মন্টুদের পুকুর, নিরিবিলি পুকুর, রাজুদের পুকুর, মুন্সীবাড়ি পুকুর, আয়নাল খাঁর পুকুর, জব্বার বিহারীর পুকুর, গোহাটা পুকুর, রাজবাড়ী বিদ্যুৎ অফিসের সামনের পুকুর, ষষ্ঠিতলাপাড়ায় ফায়ার সার্ভিস অফিসের সামনের পুকুর, খালধার সড়কের পুকুর, এসপি অফিসের পুকুর ও পুলিশ লাইনের পুকুরসহ বহু জলাধার এখন আর নেই।
শহরের ভেতরে থাকা আরও অনেক পুকুরও এখন সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে। সেখানে গড়ে উঠেছে স্থাপনা, কোথাও তৈরি হয়েছে বসতবাড়ি। আবার কোনো কোনো জলাধার ভরাট করে প্লট আকারে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
শুধু শহর নয়, জেলার বিভিন্ন এলাকাতেও কৃষিজমি, বিল ও নিম্নভূমি ভরাট করে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। হরিণার বিলসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি ভরাট করে জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে আবাসন গড়ে উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে কৃষিজমি ও জলাধার-দুই ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদই সংকুচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশবাদী আন্দোলনের (বাপা) যশোর জেলা সভাপতি আজিজুল হক মনি বলেন, একটি শহরে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অন্তত ২৫ শতাংশ সবুজায়ন থাকা প্রয়োজন। অথচ যশোরে সবুজায়নের পরিমাণ মাত্র ৭ শতাংশ। এরই মধ্যে প্রভাবশালী মহল পেশিশক্তি ব্যবহার করে খাল, নালা, পুকুর, জলাশয় ও নিম্নভূমি দখল-ভরাট করছে। এসব জায়গায় গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। ফলে যশোর ক্রমেই ইট-পাথরের জঞ্জালের শহরে পরিণত হচ্ছে।
যশোর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক আব্দুস সালাম বলেন, পুকুর, খাল, ডোবা ও নালা ভরাট হয়ে যাওয়ায় আগুন লাগলে পানির উৎস খুঁজে পেতে ফায়ার সার্ভিসকে বড় সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দূরের উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। এতে আগুন নিয়ন্ত্রণে সময় বেশি লাগে এবং প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে। তিনি বলেন, যশোর শহরকে অগ্নিঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখতে পানির রিজার্ভ ব্যবস্থা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান পুকুরগুলো সংরক্ষণ ও সংস্কার করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে ব্যক্তি উদ্যোগেও নতুন জলাধার তৈরি করতে হবে। অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্রুত পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতাও বাধাগ্রস্ত হবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, পুকুর, খাল ও জলাশয় কমে যাওয়ায় দেশীয় প্রজাতির মাছের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। আগে যেসব জলাশয়ে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত, সেগুলোর অনেকটাই এখন বিলীন হয়ে গেছে। জলাশয় রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও অনেক দেশীয় মাছ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যশোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন) বিএম কামাল আহমেদ বলেন, শহরের পুকুর ও জলাশয় রক্ষায় পৌরসভা নিয়মিত নজরদারি করছে। কোথাও পুকুর বা জলাশয় ভরাটের তথ্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। জলাধার রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সচেতন ও সহযোগী হতে হবে।
যশোরের স্থানীয় সরকারে উপপরিচালক ও পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, দিনে দিনে যশোরে পুকুর বা জলাশয় কমছে। তারপরও আমরা অভিযোগ পেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
