হিমেল খান ও শরিফুল ইসলাম
যশোরে হত্যাকাণ্ডের ধরণ বদলাচ্ছে। একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর পেছনে শুধু রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা অপরাধীচক্রের সংঘাত নয়, পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধও বড় কারণ হিসেবে সামনে আসছে।
খুনের আগে বিরোধ ছিল। কোথাও পারিবারিক কলহ, কোথাও মাদক নিয়ে দ্বন্দ্ব, কোথাও আবার আধিপত্য বিস্তার ও পূর্বশত্রুতাকে কেন্দ্র করে সংঘাত। কোনো কোনো ঘটনায় একাধিকবার মারামারি ও হুমকির ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এসব বিরোধ শেষ পর্যন্ত থামেনি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা গড়িয়েছে হত্যাকাণ্ডে। গত ছয় মাসে এমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে অন্তত পাঁচটি।
যশোরে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ১৬টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নয়টি হত্যাকাণ্ডে ছুরি বা চাকু দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। বাকি হত্যাকাণ্ডগুলো পিটিয়ে ও গুলি করে সংঘটিত হয়েছে। শুধু জুন মাসেই পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
হত্যাকাণ্ডের পর মামলা, আসামি গ্রেপ্তার ও তদন্ত শুরু হলেও এসব ঘটনার আগে থাকা বিরোধগুলো কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে এমন সব বিরোধের কথা সামনে এসেছে, যেগুলো হঠাৎ তৈরি হয়নি। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মাদক, অর্থনৈতিক সংকট, পূর্বশত্রুতা ও স্থানীয় আধিপত্যের সংঘাত অনেক ক্ষেত্রেই আগে থেকেই চলছিল বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
৬ মাসে ১৬ খুন গলা কাটা ৯ :
যশোরে চলতি বছরের ২৪ জুন পর্যন্ত ১৬টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নয়টি হত্যাকাণ্ডে ছুরি বা চাকু ব্যবহার করে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। অন্য হত্যাকাণ্ডগুলো পিটিয়ে ও গুলি করে সংঘটিত হয়েছে।
২৪ জুন সদর উপজেলার রঘুরামপুরে সাইদ সরদার ওরফে চশমা সাইদ নামে এক যুবকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছিল, মাদক কারবার নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে চৌগাছার বেড়গোবিন্দপুর বাঁওড়ের খাল থেকে আতিয়ার রহমানের লাশ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তে তার গলা কাটা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে কোপের চিহ্ন পাওয়া যায়। বাঁওড় ইজারাকে কেন্দ্র করে পূর্ববিরোধ ছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
এই দুই ঘটনাতেই হত্যার পেছনে সরাসরি বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। একটি ঘটনায় মাদক কারবার, অন্যটিতে বাঁওড়কেন্দ্রিক বিরোধ। অর্থাৎ হত্যার আগে থেকেই সংঘাতের একটি পটভূমি ছিল।
পারিবারিক সহিংসতায় নিহত অন্তত ৫
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যশোরে পারিবারিক কলহ ও পারিবারিক সহিংসতার জেরে অন্তত পাঁচজন হত্যার শিকার হয়েছেন। প্রকাশিত সংবাদ ও পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ, শাশুড়ি-পুত্রবধূর বিরোধ এবং পারিবারিক কলহের বিষয় সামনে এসেছে।
এর মধ্যে এপ্রিলে বেজপাড়ায় সকিনা বেগমকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে পুত্রবধূর বিরুদ্ধে। জুনে শেখহাটিতে সামিনা আক্তার স্বামীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন। আগস্টে তেঘরিয়ায় পারিবারিক কলহের জেরে ছেলে আনোয়ার খাতুনকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেপ্টেম্বরে শার্শায় পারিবারিক কলহের জেরে দুই শিশু সন্তানকে হত্যা করা হয়।
পারিবারিক বিরোধও যাচ্ছে প্রাণঘাতি পর্যায়ে
যশোরের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধের সহিংস রূপ নেয়া।
স্বামী-স্ত্রীর কলহ, পরকীয়া, পারিবারিক সংকট এবং মাদকাসক্ত সন্তানকে ঘিরে বিরোধ থেকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সামনে এসেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাদকাসক্ত সন্তান বাবা-মায়ের কাছে টাকা চেয়ে না পেয়ে হামলা চালিয়েছে। আবার কোথাও দাম্পত্য কলহ প্রাণঘাতি হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন কিছু ঘটনায় সংগঠিত অপরাধীচক্রের সম্পৃক্ততার চেয়ে পারিবারিক সংকট, মাদকাসক্তি, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও নিয়ন্ত্রণহীন রাগ বড় ভূমিকা রেখেছে।
এ ধরনের ঘটনা আরও একটি প্রশ্ন সামনে আনছে। পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে চলা দ্বন্দ্ব, মাদকাসক্তি বা সহিংস আচরণের বিষয়ে আগে থেকেই যদি স্বজন বা প্রতিবেশিরা অবগত থাকেন, তাহলে তা নিয়ন্ত্রণে সামাজিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?
বিরোধ থেকে সংঘাত ও খুন
যশোরের কয়েকটি সাম্প্রতিক ঘটনা বলছে, অনেক হত্যাকাণ্ডের পেছনে তাৎক্ষণিক কোনো ঘটনা থাকলেও তার আগে বিরোধের একটি দীর্ঘ ইতিহাস ছিল।
শার্শার কন্যাদহে স্থানীয় আধিপত্য ও কন্যাদহ বাঁওড়কে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধ এর একটি উদাহরণ। ৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে সেখানে ককটেল বিস্ফোরণ ও শর্টগানের গুলির ঘটনায় চারজন আহত হন। ককটেল বিস্ফোরণে দুটি বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, কন্যাদহ গ্রামের বিএনপি নেতা রেজাউল ইসলাম গাইনের লোকজনের সঙ্গে উপজেলা বিএনপির শ্রমবিষয়ক সম্পাদক শহিদ আলী এবং সদ্য বহিস্কৃত শার্শা উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম শহিদের পক্ষের লোকজনের বিরোধ রয়েছে। স্থানীয় আধিপত্য ও বাঁওড়কে কেন্দ্র করে এ বিরোধের জেরে এর আগেও কয়েক দফা মারামারি ও বোমাবাজির ঘটনা ঘটেছে।
ঘটনার দিনও দুই পক্ষের সংঘর্ষে ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলির ঘটনা ঘটে। এতে চারজন আহত হন।
এ ঘটনায় সেদিন কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। কিন্তু একই বিরোধের জেরে আগে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটার পরও নতুন করে সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, স্থানীয় বিরোধ কীভাবে ধীরে ধীরে বড় ধরনের সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভ্যান ছিনিয়ে নিতে প্রাণ গেল চালকের
ঝিকরগাছায় ভ্যানচালক ইখলাস হত্যার ঘটনাটিও সামাজিক নিরাপত্তার আরেকটি দিক সামনে এনেছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর গঙ্গানন্দপুর ইউনিয়নের পূর্বপাড়া এলাকায় কপোতাক্ষ নদ থেকে ইখলাসের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে ভ্যান নিয়ে ভাড়ায় বের হওয়ার পর তিনি নিখোঁজ হন। পরদিন পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
পুলিশের দাবি, ভ্যান ছিনিয়ে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে ইখলাসকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা ইখলাসকে কোমল পানীয়ের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ খাওয়ানোর পর গলায় ফাঁস দিয়ে ও পানিতে ডুবিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করেছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
এ ঘটনা পারিবারিক বা রাজনৈতিক বিরোধের বাইরে অর্থনৈতিক অপরাধ কীভাবে সরাসরি হত্যায় রূপ নিতে পারে, তারও উদাহরণ।
অন্যতম কারণ মাদক
যশোরের কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে মাদককে সরাসরি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে পুলিশ। রঘুরামপুরে সাইদ সরদার হত্যায় মাদক কারবার নিয়ে বিরোধের কথা জানানো হয়েছে। আবার পরিবারের ভেতরেও মাদককে কেন্দ্র করে সহিংসতা তৈরি হচ্ছে। মাদকাসক্ত সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের বিরোধ, টাকা চাওয়া, না পেয়ে হামলা কিংবা দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি একপর্যায়ে প্রাণঘাতি হয়ে উঠছে।
ফলে মাদককে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে এর পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাবের দিকটি আড়ালে থেকে যাচ্ছে। মাদকাসক্তি থেকে পরিবারে যে সংঘাত তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং,পরিবারভিত্তিক সহায়তা ও সামাজিক উদ্যোগ কতটা আছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, যে হত্যাকাণ্ডগুলো সংগঠিত হচ্ছে তা সম্পূর্ণ আকস্মিক নয়। কোথাও আগে থেকে বিরোধ ছিল, কোথাও সংঘর্ষের ইতিহাস ছিল, কোথাও মাদককে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব চলছিল।
তবে পূর্বশত্রুতা, বারবার সংঘর্ষ, হুমকি বা পারিবারিক সহিংসতার তথ্য আগে থেকেই ছিল, সেসব ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কতটা নেয়া হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। কারণ হত্যাকাণ্ডের পর আসামি গ্রেপ্তার অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু হত্যার আগের সংঘাত থামানো গেলে প্রাণহানি এড়ানো যেতো বলে মনে করছেন তারা।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অ্যাড. মাহমুদ হাসান বুলু বলেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা কিশোর গ্যাংয়ের কারণে অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পেছনে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তার মতে, হত্যাকাণ্ডের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ছুরি ও চাকুর ব্যবহার। প্রথম ছয় মাসে ১৬ হত্যাকাণ্ডের মধ্যে নয়টিতেই গলা কাটার ঘটনা ঘটেছে। ছুরি বা চাকু সহজে বহন ও ব্যবহার করা যায় বলে অপরাধে এর ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহর ও শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় ছুরি দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটছে।
সচেতন নাগরিক ছোলজার রহমান বলেন, যশোরে হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। তার মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন পক্ষের বেপরোয়া আচরণ, মব সহিংসতা এবং পুলিশের ভূমিকার পরিবর্তনের বিষয়গুলোও অপরাধ পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিজস্ব মতামত।
অভিযান অব্যাহত : পুলিশ
যশোরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্ট ও তল্লাশি চৌকি বসানো হচ্ছে। ডিবি, থানা পুলিশ ও পুলিশ লাইনের সদস্যরা এসব কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি ও আকস্মিক অভিযান চালানো হচ্ছে। ডিবি, থানা পুলিশ ও পুলিশ লাইনের সদস্যরা নিয়মিত এসব দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সান্ধ্যকালীন অভিযান চলছে। তাদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত বিভিন্ন জায়গা এবং রেলস্টেশনেও নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। পুলিশি কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজ থেকে সচেতনতা তৈরি করা গেলে কিশোর অপরাধ কমানো সম্ভব।
যশোর সরকারি এম এম কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতা, মাদকাসক্তি, স্থানীয় আধিপত্য ও দীর্ঘদিনের বিরোধকে ছোট সমস্যা হিসেবে না দেখে শুরুতেই গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
যশোরে সাম্প্রতিক ১৬ হত্যাকাণ্ড শুধু লাশের সংখ্যাই নয়, হত্যার আগে থাকা সেই বিরোধগুলোর দিকেও নজর দেয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
