মারুফ কবীর :
যশোরের বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্কুল ও কলেজের প্রধান ফটক কিংবা সীমানা ঘেঁষে বিক্রি হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর, মানহীন ও খোলা খাবার।
প্রতিদিন টিফিন ও ছুটির সময়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা এসব খাবার সানন্দে গ্রহণ করলেও এর পেছনে লুকিয়ে থাকা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জানেনা তারা। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অপরিস্কার ও কেমিক্যালযুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে শিক্ষার্থীরা স্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। টিফিন ও ছুটির সময় ভ্রাম্যমাণ এসব খাবারের দোকান বসে।
দেখতে আকর্ষণীয় ও মুখোরোচক হওয়ায় বিশেষ করে শিশুরা আকৃষ্ট হয় এসব মানহিন খাবারের দিকে।
যশোর শহরের স্বনামধন্য বিভিন্ন প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের প্রধান ফটকের সামনে এবং রাস্তার দুধারে গড়ে উঠেছে ভাসমান হকার ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের দোকান। সাধারনত এসব দোকানে বিক্রিত খাবার খোলা ও ধুলোবালিযুক্ত। মুখোরচক-ঝালমুড়ি, ফুচকা, চটপটি, আচার, আলুর চপ ও সিঙ্গাড়া, যা কোনো ঢাকনা ছাড়াই খোলা অবস্থায় রাস্তার পাশে রাখা থাকে।
এমনকি ক্ষতিকর কেমিক্যাল ও রংযুক্ত খাবারের মধ্যে আইসক্রিম, রঙ্গিন শরবত, হাওয়ায় মিঠায় এবং বিভিন্ন স্বাদের ড্রিংকস বিক্রি হচ্ছে হরহামেশা। পোড়া তেলে ভাজা হয় স্ন্যাক্স জাতীয় খাবার। একই তেল বারবার ব্যবহার করে তৈরি করা হয় ক্ষতিকর ভাজাপোড়া খাবার। হকাররা মানেন না স্বাস্থ্যবিধি ও পরিবেশ।
সরেজমিনে দেখা যায়, অধিকাংশ দোকানদার অপরিচ্ছন্ন ভাবে খাবার পরিবেশন করেন। হাত ধোয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা এবং যে পানি দিয়ে থালা-বাসন ধোয়া হয়, তাও অত্যন্ত নোংরা ও দূষিত। রাস্তার যানবাহন থেকে উড়ে আসা ধুলোবালি এবং মাছি অনবরত খাবারের ওপর বসছে। তা সত্ত্বেও আকর্ষণীয় রং ও কম দাম হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা এসব খাবারের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন অভিভাবক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
রেবেকা সুলতানা নামে এক অভিভাবক জানান, বাড়ি থেকে টিফিন দেয়া হলেও বেশিরভাগ দিন দেখা যায় টিফিন খায়না বাচ্চা। অন্য বাচ্চাদের দেখা দেখি বিদ্যালয়ের বাইরে বা প্রাচির ঘেসে গড়ে ওঠা হকারদের কাছ থেকে খোলা ও নোংরা খাবার খায়। নিষেধ করলেও শোনে না। প্রশাসনের উচিত দ্রুত এসব দোকান উচ্ছেদ করা অথবা কঠোর নজরদারির আওতায় আনা।
এ বিষয়ে যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা.নাজমুস সাকিব রাসেল বলেন, এসব খাবারে পানিবাহিত রোগ হয়। যা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। ফুড পয়জনিং, ডায়েরিয়া এমনকি কলেরা মতো মারাত্মক রোগ হতে পারে। সেজন্য অস্বাস্থ্যকর এসব খাবার পরিহার করতে হবে। এ বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। বাচ্চাদের জন্য বাড়ি থেকে খাবার দিতে হবে। যাতে স্কুল কলেজে গিয়ে শিক্ষার্থীরা মানহিন খাবার গ্রহণ না করে।
যশোর কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক এহসানুল হক সুমন জানান, আমরা অ্যাসেম্বলি ও ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের রাস্তার খোলা খাবার না খাওয়ার জন্য বারংবার নিষেধ করি। তবে স্কুলের সীমানার বাইরে হওয়ায় আমরা সরাসরি এসব দোকান নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খোলা ও বাসি খাবার গ্রহণের কারণে শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে খাকে। বিশেষ করে পানিবাহিত ও পেটের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এর মধ্যে ডায়রিয়া, ফুড পয়জনিং, আমাশয়, পেটে ব্যথা ও বমি অন্যতম। খাবারে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ টেক্সটাইল রং ও কেমিক্যালের কারণে লিভার, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ টাইফয়েড ও জন্ডিসের মতো বড় ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সচেতন মহল ও অভিভাবকদের দাবি, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত শহরের স্কুল-কলেজ প্রাঙ্গণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা দরকার। পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি বন্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তারা।
দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে প্রকাশ্যে এভাবে অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি হলেও নজরদারির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা উদ্বেগজনক। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা না করা এবং বাজার তদারকির অভাবই হকারদের এভাবে নিয়ম ভেঙে খাবার বিক্রিতে উৎসাহিত করছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্বাস্থ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে অনতিবিলম্বে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনার জোর দাবি জানিয়েছে অভিভাবক ও সচেতন মহল।
স্কুল-কলেজের সামনে বিক্রি হওয়া এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার নিয়ে অভিভাবক মহলে কাজ করছে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ। সন্তানদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিয়ে শঙ্কিত একাধিক অভিভাবক তাদের মতামত ও অভিযোগ প্রকাশ করেছেন। সন্তানরা টিফিনের পুষ্টিকর খাবার না খেয়ে কিংবা বাড়ি থেকে আনা টিফিন ফেলে রেখে বাইরের এসব বাহারি রঙের ক্ষতিকর খাবার গ্রহণ করছে। নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা প্রলুব্ধ হয়ে এগুলো কিনছে।
খোলা ও বাসি খাবার খাওয়ার কারণে প্রায় প্রতিদিনই অনেক শিক্ষার্থী পেট ব্যথা, ডায়রিয়া, বমি ও ফুড পয়জনিংয়ে ভুগছে। ফলে চিকিৎসকদের কাছে দৌঁড়াদৌঁড়ি অভিভাবকদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবিলম্বে স্কুল-কলেজ এলাকা থেকে এসব মানহীন ও দূষিত খাবারের দোকান উচ্ছেদ করা অথবা তদারকির মাধ্যমে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
অভিভাবকদের দাবি, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে নিয়মিত অভিযান ও জরিমানা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি স্কুলে সাশ্রয়ী মূল্যে পুষ্টিকর ও মানসম্মত টিফিন বিক্রির জন্য স্বাস্থ্যকর ক্যান্টিনের ব্যবস্থা করতে হবে।
মুক্তা ইয়াসমিন নামে এক অভিভাবক বলেন, সন্তানদের পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি তাদের পছন্দ অনুযায়ী ঘরোয়া উপায়ে রুচিসম্মত টিফিন তৈরি করে দিতে হবে। সন্তানরা প্রায়ই একই ধরনের টিফিন খেতে একঘেয়েমি বোধ করে। তাই ঘরেই পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি তাদের পছন্দ অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর ও মুখরোচক টিফিন তৈরি করে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, টিফিনের জন্য অতিরিক্ত টাকা দেয়ার অভ্যাস কমানো, যাতে শিক্ষার্থীরা বাইরের দোকান থেকে খাবার কেনার সুযোগ না পায়।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যশোর জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. সেলিমুজ্জামান বলেন, বিদ্যালয়ের সামনে অস্বাস্থ্যকর খাবারের দোকানের বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
যশোর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) জয়নুল আবেদীন বলেন, ভ্রাম্যমাণ অস্বাস্থ্যকর খাবারের হকারদের উচ্ছেদের করা হলেও তারা আবার আসে। তবে বিদ্যালয়ের মধ্যে বা সামনে যাতে না আসে সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
যশোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) হোসনেআরা পারভীন বলেন, টিফিনের সময় গেটের নিচ দিয়ে মেয়েরা ওই সব খাবার কিনে খায়। সম্প্রতি আমরা উদ্যোগ নিয়েছি গেটের নিচের খালি জায়গা তার বা অন্য কোনো উপায়ে বন্ধ করে দিবো। যাতে বাইরের খাবার মেয়েরা খেতে না পারে। এ বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। একই সাথে বাসা থেকে খাবার এনে টিফিনে খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
যশোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক আহসান হাবিব পারভেজ জানান, বিদ্যালয় চত্তরে অস্বাস্থ্যকর খাবারের হকার না থাকলেও প্রধান ফটকও পেছনের গেটে বসে দোকানীরা। তাদেরকে হটানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
যশোর ইনসটিটিউট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিরিন সুলতানা বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ের পাশে টাউন হল মাঠ। সেখানে খাবারের হকাররা বসে। তবে আমার স্কুলের সামনে ওইসব হকারদের বসতে দিই না। অভিভাবকদের সবসময় বলি বাসা থেকে টিফিনের জন্য খাবার দেয়ার জন্য।
নবকিশালয় স্কুলের প্রধান শিক্ষক লায়লা শিরিন সুলতানা বলেন, বিশেষ করে স্কুল ছুটির পর শিক্ষার্থীরা বাহিরে গিয়ে খাবার খায়। আমরা বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আগেও অভিভাবকদের জানিয়েছি ওইসব খাবার আপনাদের সন্তানদের দিবেন না। এমনকি ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকানীদের উচ্ছেদের ব্যবস্থা করা হয়েছে অনেকবার, তারপরও তারা এসে আবারও বসে। তবে এ বিষয়ে আরও কঠর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ও যশোর কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের পরিচালনা পর্যদের অন্যতম সদস্য খান মাসুম বিল্লাহ বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরাও চিন্তিত। বিদ্যালয়ের পক্ষে থেকে পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি। এমনকি অভিভাবকদের সাথে কথা বলে প্রযোজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়ের মধ্যে ক্যান্টিন স্থাপন করে স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
আইন বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিই হতে পারে এই সংকট সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত সচেতনতাই পারে এই অস্বাস্থ্যকর খাবারের সংস্কৃতি বন্ধ করতে।
