বাংলার ভোর প্রতিবেদক
আর মাত্র কয়েক দিন পরই শুরু হতে যাচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। আগামী ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে এবারের দুর্গোৎসব। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের এই আয়োজন। উৎসবকে সামনে রেখে যশোরের মন্দির-মণ্ডপগুলোতে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও প্রতিমায় দেয়া হচ্ছে মাটির শেষ প্রলেপ, কোথাও চলছে রং-তুলির শেষ আঁচড়। পাশাপাশি মণ্ডপ সাজানোর কাজেও ব্যস্ত সময় পার করছেন আয়োজকরা।
শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠে মাঠে কাশফুলের দোলা আর হালকা বাতাসে প্রকৃতিতে এখন উৎসবের আবহ। এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী আয়োজন নিয়ে সবার নজর কেড়েছে যশোর শহরতলীর চাঁচড়া বর্মনপাড়ার শ্রীহরি মন্দির। একই মন্দির প্রাঙ্গণে এবার তৈরি করা হচ্ছে ১০১টি প্রতিমা।
মাটি, খড় ও বাঁশের কাঠামোয় ধীরে ধীরে পূর্ণতা পেয়েছে দেব-দেবীর এসব প্রতিমা। শিল্পীদের নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে সনাতন ধর্মের বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি ও দেব-দেবীর নানা রূপ। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিমাগুলো দেখতে এরই মধ্যে মন্দিরে ভিড় করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি কৌতুহল। অধিকাংশ প্রতিমার নির্মাণ কাজ শেষ। এখন চলছে রং, অলংকার ও সাজসজ্জার কাজ।
মন্দির প্রাঙ্গণে প্রতিমা দেখতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা নিষ্কৃতি বর্মন বলেন, প্রতিবছর বিভিন্ন মণ্ডপে পূজা দেখতে যাওয়া হয়। এবার নিজেদের মন্দিরেই ১০১টি প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। একসঙ্গে এতগুলো প্রতিমা দেখার সুযোগ হওয়ায় এবার পূজার আনন্দও বেশি হবে বলে মনে করছেন তিনি।
আরেক দর্শনার্থী শিপ্রা বর্মন বলেন, বিয়ের পর থেকে প্রতিবছর শ্বশুরবাড়িতে দুর্গাপূজা দেখে আসছেন। তবে এবারই প্রথম এত বড় আয়োজন দেখছেন। পূজার সময় পরিবারের সবাইকে নিয়ে ১০১টি প্রতিমা দেখতে আসবেন বলে জানান তিনি।
মন্দিরে প্রতিমা দেখতে আসা শিশু শুভ চক্রবর্তী নামে এক দর্শনার্থী বলে, এতগুলো প্রতিমা একসঙ্গে আগে কখনো দেখিনি। কোন প্রতিমাটি বেশি ভালো লেগেছে, তা বন্ধুদেরও দেখাতে চায় সে।
শহরের বকচর এলাকার লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দিরের মৃৎশিল্পী শ্রী গোপাল পাল বলেন, দুর্গোৎসবের সময় ঘনিয়ে আসায় প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ততা বেড়েছে। এখন মূলত রং ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে শিল্পীদের ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে।
আয়োজকেরা জানান, প্রতিবছর এই মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হলেও এবারই বিশেষভাবে ১০১টি প্রতিমা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রায় দুই মাস ধরে শিল্পীরা এসব প্রতিমা তৈরির কাজ করেছেন। প্রতিমাগুলোর মাধ্যমে সনাতন ধর্মের বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি ও দেব-দেবীর নানা রূপ তুলে ধরা হবে। এখন চলছে শেষ মুহূর্তের রং ও সাজসজ্জার কাজ।
বর্মনপাড়া গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিমুল বর্মন বলেন, প্রতিবছরই এখানে দুর্গাপূজা হয়। তবে এবারের আয়োজনের বিশেষ আকর্ষণ ১০১টি প্রতিমা। প্রতিমাগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি তুলে ধরা হবে। এই আয়োজন দেখতে যশোরসহ দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা মন্দিরে আসবেন বলে আশা করছেন তারা।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, ব্যতিক্রমী এই আয়োজন দেখতে দুর্গোৎসবের দিনগুলোতে যশোরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটবে। বিশেষ করে শিশু ও নারীদের মধ্যে ১০১ প্রতিমার এই আয়োজন বাড়তি আগ্রহ তৈরি করবে বলে মনে করছেন তারা।
শুধু বর্মনপাড়ার শ্রীহরি মন্দির নয়, দুর্গোৎসব ঘিরে পুরো যশোরেই চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। জেলা পূজা উদযাপন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এবার জেলায় ৭৩৯ টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছরের তুলনায় বেড়েছে ২৪টি মণ্ডপ। এরই মধ্যে বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপে প্রতিমা তৈরি, সাজসজ্জা, আলোকসজ্জাসহ অন্যান্য প্রস্তুতির কাজ চলছে।
এছাড়া গত বছর জলাবদ্ধতার কারণে ভবদহ এলাকার বিভিন্ন স্থানে দুর্গোৎসব আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এবার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় সেখানে আবারও পূজার আয়োজন করা হচ্ছে। এতে ওই এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও ফিরেছে উৎসবের আমেজ।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন কমিটির যশোর জেলার সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার ঘোষ বলেন, যশোরে দুর্গোৎসব আয়োজনে কোনো ধরনের সমস্যা নেই। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সমন্বয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পূজাকে ঘিরে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ নেই বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে শরতের আবহে যশোরজুড়ে এখন দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি। আর চাঁচড়া বর্মণপাড়ার শ্রীহরি মন্দিরের ১০১ প্রতিমার ব্যতিক্রমী আয়োজন এরই মধ্যে তৈরি করেছে বাড়তি কৌতুহল। উৎসবের দিনগুলোতে এই আয়োজন দেখতে যশোরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীদের সমাগম হবে বলে প্রত্যাশা আয়োজকদের।
