ইমরান হোসেন পিংকু
যশোরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করে খুলেছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। অভয়নগরের প্রেমবাগে ৫০৩ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ইপিজেড। প্রায় ১ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পে সরাসরি-পরোক্ষভাবে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পদ্মা সেতু, মোংলা বন্দর ও রেল যোগাযোগের সুবিধায় যশোরকে ঘিরে শিল্পায়নের স্বপ্নও এখন বাস্তবতার পথে।
কিন্তু এই স্বপ্নের উল্টো পিঠে জমি হারানো মানুষের দীর্ঘশ্বাস। ইপিজেডের জন্য অধিগ্রহণ করা জমির ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, ৪ বিঘা জমির যে ক্ষতিপূরণ দেয়া হচ্ছে, তা দিয়ে আশপাশে ১ বিঘা জমিও কেনা যাচ্ছে না। তার ওপর ক্ষতিপূরণের টাকা পেতেও বছরের পর বছর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ঘুরতে হচ্ছে তাদের।
প্রকল্পের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিক প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন। জেলা প্রশাসনকে জমি অধিগ্রহণ বাবদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৬৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ জমির মালিক ক্ষতিপূরণের অর্থ পেয়েছেন। অর্থাৎ বড় একটি অংশ এখনও অপেক্ষায়। কারও নথিপত্রের জটিলতা, কারও নামজারি বা মালিকানা সংক্রান্ত সমস্যা-বিভিন্ন কারণে আটকে আছে ক্ষতিপূরণ।
‘নিজের টাকাই নিতে ভিক্ষুকের মতো ঘুরি’
ইপিজেড প্রকল্প এলাকায় সরেজমিনে কথা হয় বনগ্রাম গ্রামের মহাসীন আলী, আনোয়ার সরদার, আমিনুল ইসলাম, আজিমুল ইসলাম, কৃপা মালো এবং প্রেমবাগ গ্রামের বাবুল হোসেনের সঙ্গে। তাদের সবার অভিযোগ, চার বিঘা জমি বিক্রির টাকা দিয়ে আশপাশের এক বিঘা জমি কিনতে পারছি না। জমির প্রকৃত বাজারদর অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ মিলছে না। আবার সেই টাকাও সময়মতো হাতে আসছে না।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলেন, ‘নিজেদের জমির ক্ষতিপূরণের টাকা নিতে ডিসি অফিসে ভিক্ষুকের মতো ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। আমরা ভিটেমাটি হারিয়ে এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে।’
ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, জমির বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্ষতিপূরণ পুনর্নিধারণ করতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত ও হয়রানিমুক্তভাবে ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
দলিলের দামে আটকে প্রকৃত বাজারমূল্য
প্রশাসন অবশ্য বলছে, জমির মূল্য নির্ধারণে সরকারি আইনই অনুসরণ করা হচ্ছে। স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭ অনুযায়ী গ্রামীণ এলাকায় বাজারমূল্যের ওপর ২০০ শতাংশ অতিরিক্তসহ তিন গুণ ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান রয়েছে।
যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, অর্পিত সম্পত্তি সেল) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বাসুদেব কুমার মালো বলেন, ‘যে মৌজায় জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে, সেই মৌজায় গত ১২ মাসে সম্পাদিত জমির সাব-রেজিস্ট্রি দলিলের গড় মূল্যের ওপর ভিত্তি করে দাম নির্ধারণ করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘সমস্যাটা অন্য জায়গায়। জমি রেজিস্ট্রেশনের সময় সরকারি কর বাঁচাতে অধিকাংশ মানুষ প্রকৃত বাজারদরের চেয়ে দলিলে অনেক কম দাম দেখান। সরকার যখন সেই দলিলের গড় হিসাব করে, তখন তা বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক নিচে নেমে যায়। ফলে তিন গুণ ক্ষতিপূরণ দিলেও তা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অনেক কম হয়ে দাঁড়ায়।’
তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে ৩০-৪০ শতাংশ জমির মালিক ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছেন। বাকি মালিকদেরও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অর্থ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
শিল্পায়নের স্বপ্ন বনাম জমির মালিকের বাস্তবতা
৫০৩ একর জমির ওপর নির্মাণাধীন যশোর ইপিজেডে ৪৩৮টি শিল্প প্লট তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ২০০টি প্লট বরাদ্দের জন্য প্রস্তুত। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়াজাত পণ্য, ইলেকট্রনিক্স ও কৃষিভিত্তিক শিল্পসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান এখানে গড়ে ওঠার কথা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। বর্তমানে প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি প্রায় ১৫-২০ শতাংশ। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা থাকলেও সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পুরোপুরি সচল হয়ে উৎপাদনে যেতে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ সময় লাগতে পারে।
যশোর ইপিজেডে সরাসরি প্রায় দেড় লাখ এবং পরিবহন, লজিস্টিকস, আবাসন ও অন্যান্য সেবাখাতে আরও প্রায় ৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। মোংলা বন্দরের মাত্র ৬০-৬৫ কিলোমিটার দূরত্ব, পাশের রেলপথ, পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ-সব মিলিয়ে বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে প্রকল্পটি।
