কামরুজ্জামান টিটু :
যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালসংলগ্ন ঘোপ নওয়াপাড়া রোড ও চারপাশের এলাকাগুলোতে তীব্র যানজট ও ফুটপাত দখলের কারণে তৈরি হয়েছে চরম জনদুর্ভোগ। হাসপাতাল মোড় থেকে নিকুঞ্জ মোড় পর্যন্ত এলাকার যানজট এখন নিত্যদিনের চিত্র। অ্যাম্বুলেন্স চলাচল ব্যাহত হওয়া থেকে শুরু করে রোগী ও সাধারণ মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান দেখা যাচ্ছে না। এর পেছনে অবৈধ দোকানপাট, অপরিকল্পিত ইজিবাইক স্ট্যান্ড এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে।
গেট দখল করে দোকানপাট, অচল অ্যাম্বুলেন্স রুট
হাসপাতাল সংলগ্ন প্রধান তিনটি গেটের মুখে অন্তত ১৬টি অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে। চা, পান-সিগারেট, আখের রস ও ফল বিক্রির এসব দোকানের কারণে গেট দিয়ে ভেতরে রোগী নিয়ে ঢোকা এবং বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া হাসপাতাল মোড় থেকে প্রাচীর ঘেষে ৩ নম্বর গেট পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে আরও প্রায় ২০টি ভ্রাম্যমাণ ভ্যান দাঁড়িয়ে পণ্য বিক্রি করছে। এর ফলে প্রধান সড়কটি মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
চায়ের দোকানের আড়ালে ইয়াবা কারবার ও রোগী লাঞ্ছনা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব অস্থায়ী দোকানের কয়েকটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মাদকের সিন্ডিকেট। বিশেষ করে সিসিইউ (করোনারী কেয়ার ইউনিট) ভবনের সামনের পকেট গেট ও মাঝের গেটের কয়েকটি চায়ের দোকানের আড়ালে সরাসরি ইয়াবা বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় এসব ব্যবসা চলায় সাধারণ মানুষ বা ব্যবসায়ীরা প্রতিবাদ করতে ভয় পান। ইতিপূর্বে প্রতিবাদ করায় রোগী ও তাদের স্বজনদের ওপর একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ মিলেছে।
অবৈধ ইজিবাইক স্ট্যান্ড ও ওষুধের দোকান মালিকদের ক্ষোভ
হাসপাতাল মোড়ের ভৈরব সুপার মার্কেট ও একতা হাসপাতালের কোণে কালভার্টের পাশে গড়ে উঠেছে অননুমোদিত ইজিবাইক স্ট্যান্ড। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
ভৈরব সুপার মার্কেটের ‘ঔষধ ঘর’-এর স্বত্বাধিকারী বিনোদ সর্দার বলেন, “সারাদিন দোকানের সামনে ইজিবাইক দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করায় কাস্টমার ঢুকতে পারে না। সরতে বললে চালকরা জোটবদ্ধ হয়ে মারমুখী আচরণ করে।”
জামান মেডিসিন এন্ড সার্জিক্যালের মালিক কাজী শাহিনুজ্জামান মাছুম জানান, “হাসপাতালের পুরাতন গেটটি সন্ধ্যায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। পকেট গেট দিয়ে রোগী যাতায়াত করে, কিন্তু ইজিবাইকের জটলা পার হয়ে ক্রেতারা দোকানে আসতে চান না।”
একই অভিযোগ করেছেন ট্রপিক্যাল ফার্মেসি ও বর্ষা ফার্মেসিসহ আশেপাশের অন্যান্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীরা।
বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নিজস্ব পার্কিং সংকট
ঘোপ নওয়াপাড়া রোডে অবস্থিত বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় যানজট আরও প্রকট হচ্ছে। বিশেষ করে মডার্ণ হাসপাতাল, ইউনিক হাসপাতাল, যশোর ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং কিংস হাসপাতালের সামনে সড়ক দখল করে প্রাইভেটকার ও অ্যাম্বুলেন্স পার্ক করে রাখা হয়। ১০-১৫ মিনিটের জন্য এসব যানবাহন দাঁড়ালে পুরো সড়কে দেড় থেকে দুই ঘণ্টার স্থবিরতা তৈরি হয়, যা আশঙ্কাজনক রোগীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে।

দৈনিক লাখ টাকার চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট
স্থানীয় একাধিক সূত্রের মতে, সড়ক ও ফুটপাত দখল করে অবৈধভাবে দোকান ও ভ্যান বসানোর পেছনে কাজ করছে রাজনৈতিক প্রভাবশালী চক্র।
ফুটপাতের প্রতিটি অস্থায়ী দোকান থেকে দৈনিক সর্বনিম্ন ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানদার জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে ঘোপ নওয়াপাড়া রোড ও সেন্ট্রাল রোডের দুজন ব্যক্তি এসব চাঁদা তুলতেন। বর্তমানে নওয়াপাড়া রোডের ৩ জন এবং পুরাতন কসবার একজন পুস্তক ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে সন্ধ্যার পর টাকা আদায় করা হয়।
এ বিষয়ে কথা হয় যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত এর সঙ্গে। বাংলার ভোরকে তিনি বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার পর অন্তত পক্ষে ৪ থেকে ৫ বার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে হাসপাতাল গেট থেকে এসব দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে।
কিন্ত মজার ব্যাপার হচ্ছে, অভিযানের রেশ না কাটতেই এরা পুনরায় বসে পড়ে। নতুন করে আবার এ দলে যুক্ত হয়েছে তিন চাকার ভ্যান গাড়ি। অভিযান শুরু হলেই এসব ভ্যান গাড়ী দ্রুত সটকে পড়ে।
হাসপাতালের প্রবেশমুখে পৌঁছে কোন রোগী বা তার স্বজনকে যেন আর ভোগান্তিতে পড়তে না হয় এজন্য বরাবরের মতো পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবার মিটিংয়ে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরবেন বলে জানান ডা. শাফায়াত।
জানতে চাইলে যশোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী বিএম কামাল আহম্মেদ বলেন, শুধু হাসপাতাল গেট নয়, গোটা শহরেই আজ একই চিত্র। আমরা হাসপাতাল গেট থেকে অসংখ্যবার অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করেছি। সকালে উচ্ছেদ করি আবার বিকেলে বসে পড়ে। সব সময় তো আর পৌরসভার লোক গেট পাহারা দিতে পারে না। ফলে যা হবার তাই হয়।
কামাল আহম্মেদ আরো বলেন, আমার চাকরি আর বেশিদিন নেই। প্রশাসক স্যারের অনুমতি পেলে দুই দিনে যশোর শহর পরিস্কার করে ফেলতে পারি। এসব আমার কাছে কোন বিষয় না।
জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যশোরের পরিদর্শক নাজমুল হোসেন খান বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য এবং যাচাইয়ে সত্যতা পেলে মাদক বিক্রেতা বা সিন্ডিকেট সদস্যদের আটক করা হবে। সম্প্রতি আমরা হাসপাতাল এলাকা থেকে শাহজাহান নামে এক মাদক কারবারিকে মাদকসহ হাতেনাতে আটক করতেও সক্ষম হয়েছিলাম।
এ বিষয়ে যশোর ট্রাফিক পুলিশ বিভাগের ইনচার্জ টিআই মাহফুজুর রহমান বলেন, অবৈধ দোকান পাটের জন্য যানজট হয়। কিন্তু সেটা মারাত্মক আকার ধারণ করে যখন একই সাথে স্কুল-কলেজ, অফিস ছুটি হয়। তাছাড়া আমাদের ট্রাফিক বিভাগের কর্মীরা প্রতিনিয়ত এ অঞ্চলে যানজট নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে।
