বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
যশোরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, ছিনতাই বৃদ্ধি এবং কুখ্যাত আসামিদের জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান। একই সঙ্গে জেলার ভয়াবহ জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি মোকাবিলায় মৎস্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব সরকারি দপ্তরকে মাঠে থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। নাগরিক নিরাপত্তা জোরদারে বিশেষ রেসপন্স টিম গঠন, অপরাধ পরিস্থিতি মূল্যায়নে উচ্চপর্যায়ের কমিটি, ফুটপাত দখলমুক্তকরণ এবং ইজিবাইক-রিকশার লাইসেন্স ব্যবস্থা কঠোরভাবে কার্যকরের ঘোষণাও দেন জেলা প্রশাসক।
রোববার সকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক জরুরি সভায় এসব সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা আসে। সভায় জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভবদহসহ বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতা-দুই সংকটই গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় উঠে আসে।
সভার শুরুতেই কমিটির সদস্যরা জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সিনিয়র আইনজীবী দেবাশীষ বলেন, জজকোর্ট মোড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বস্তাভর্তি ফেনসিডিলের খালি বোতল পাওয়া যাচ্ছে এবং সেখানে নিয়মিত অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে। বাস্তব পরিস্থিতি এমন হলেও আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক দাবি করা হচ্ছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মিজানুর রহমান খান বলেন, লোকচক্ষুর আঁড়ালে নানা ধরনের অপরাধ বাড়ছে। বিশেষ করে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা উদ্বেগজনক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
কমিটির সদস্যদের বক্তব্যের পর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, শহরে ছিনতাই বেড়েছে-এটি বাস্তবতা। একই সঙ্গে কুখ্যাত অনেক আসামি বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসছে। বিষয়টি প্রশাসনের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
‘যশোরে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, ছিনতাই বৃদ্ধি এবং কুখ্যাত আসামিদের জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় জনদুর্ভোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে মাঠে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ রেসপন্স টিম, অপরাধ বিশ্লেষণে উচ্চপর্যায়ের কমিটি এবং নগর ব্যবস্থাপনায় একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান।’
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেড়েছে। এটি উদ্বেগের বিষয় এবং প্রশাসন এ প্রবণতা রোধে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
জেলা প্রশাসক জানান, অপরাধ পরিস্থিতি বিশ্লেষণে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সাড়া দিতে একটি বিশেষ রেসপন্স টিম গঠন করা হবে। এ টিমের জন্য পৃথক হটলাইন নম্বর চালু করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ দ্রুত অভিযোগ জানাতে পারেন।
নগর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি ইজিবাইক ও রিকশার লাইসেন্স ব্যবস্থা কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না বলে স্পষ্ট করে দেন জেলা প্রশাসক। এছাড়া হাউজিং প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সব ধরনের বরাদ্দ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সভায় জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, জনবল সংকট থাকলেও পুলিশ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
সভায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। জেলা প্রশাসক জানান, বন্যা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। ইতোমধ্যে দুর্গত মানুষের মধ্যে ২৭ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ত্রাণ বরাদ্দ চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করা হবে এবং প্রয়োজনে প্রশাসনের কর্মকর্তারাই সরাসরি ত্রাণ নিয়ে দুর্গত এলাকায় যাবেন।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জলাবদ্ধতায় মাছের ঘের ও মৎস্যচাষিরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
তাই সব কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলকভাবে মাঠে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
শহরের জলাবদ্ধতা কমাতে দ্রুত ড্রেন পরিস্কার এবং ঝোপ-জঙ্গল অপসারণের জন্য পৌরসভাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের ফলে এবার দ্রুত পানি নিস্কাশনের আশা করা যাচ্ছে। অভয়নগরের ইপিজেড এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পানি প্রবাহ সচল রাখতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে কালভার্ট প্রশস্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, ড্রেনে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনাই শহরের জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। নিয়মিত পরিস্কার কার্যক্রম ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তিনি জানান, পানিবন্দি মানুষের জন্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে রান্না করা খাবার বিতরণ অব্যাহত রয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে ত্রাণ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কমলেশ মজুমদারের সঞ্চালনায় সভায় স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক ও পৌর প্রশাসক সৈয়দ রফিকুল হাসান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সুজন সরকার, সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা, আনসার ও ভিডিপির ঊর্ধ্বতন কমান্ড্যান্ট মাজহারুল ইসলাম ভূঁইয়াসহ জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।


