বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
যশোরে টানা বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্ন আয়ের ও শ্রমজীবী মানুষ। বৃষ্টির কারণে স্বাভাবিক কর্মজীবন ব্যাহত হওয়ায় অনেকেই আয়-রোজগার করতে পারেননি। ফলে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন নিন্ম আয়ের মানুষ।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া ভারি বর্ষণ শুক্রবার বেলা ২টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলতে থাকে। এরপর শনিবার ও রোববার কখনও হালকা, কখনও মাঝারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে। যশোর বিমানবাহিনী মতিউর রহমান ঘাঁটির আবহাওয়া দফতর সূত্রে জানা গেছে, যশোরে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ১৯৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
টানা বৃষ্টিতে শহরে বিভিন্ন ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সড়ক ও অনেক বাসা-বাড়ির ভেতর পানিতে ঢুকে তলিয়ে যায়। এতে কয়েক হাজার পরিবারে পানিবন্দি হয়ে পড়েন। বন্ধ হয়ে যায় নিন্ম আয়ের মানুষের আয় রোজগারও।
জলাবদ্ধতার কারণে শহরের বিভিন্ন বাজার, ফুটপাত ও খোলা জায়গায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে পড়েন। অব্যাহত বৃষ্টির কারণে অনেকেই দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।
শহরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মাইকপট্টি এলাকার চায়ের দোকানদার ফারুক হোসেন জানান, বিরতিহীন বৃষ্টির কারণে তিনি সময়মতো দোকান খুলতে পারেনি।
এই ওয়ার্ডের সড়কের ধারের ফল ব্যবসায়ী মাসুম বিল্লাহ বলেন, বৃষ্টিতে মানুষের উপস্থিতি খুবই কম ছিলো। ফলে বৃষ্টিতে ভিজে দোকান খুলে রেখেও আশানুরূপ বিক্রি করতে পারেননি তিনি।
একই চিত্র দেখা গেছে নিউমার্কেট, দড়াটানা, চৌরাস্তা, পালবাড়ী মোড়, মণিহার, আরবপুরসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায়। বৃষ্টির কারণে কেউ বন্ধ রেখেছিলেন দোকানপাট, কেউ আবার কোন রকম দোন খুললেও ক্রেতা সংকটে বেচাকেনা করতে পারেননি।
রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক ও অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ জানান, গত তিন দিন ধরে বৃষ্টির কারণে তারা নিয়মিত কাজ করতে পারেননি। দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সংসার চালাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। একদিন কাজ না থাকলে যেখানে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে, সেখানে টানা বৃষ্টিতে কর্মহীন থাকায় তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
রমজান আলী নামের এক নির্মাণশ্রমিক জানান, তিন দিন পর রোববার তিনি এসেছিলেন লালদীঘির পাড়ে শ্রমিক হাটে। কিন্তু দুই দিন কাজ না থাকায় তিনি চরম সংকটে পড়েছেন।
রহমত নামের এক রিকশাচালক বলেন, রিকশা নিয়ে বাইরে বের হলেও যাত্রীর উপস্থিতি কম থাকায় সাধারণ সময়ের চেয়ে আয় অনেক কম হয়েছে।
এদিকে টানা বৃষ্টির কারণে সাধারণ নাগরিকদের দুর্ভোগও চরম আকার ধারণ করেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই ঘর থেকে বের হতে পারেননি। তবে যাদের চাকরি, চিকিৎসা কিংবা অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হতে হয়েছে, তাদের অনেকেই অতিরিক্ত ভাড়া গুণে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, বৃষ্টিকে অজুহাত করে অনেক রিকশাচালক স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি ভাড়া দাবি করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত বা প্রচলিত ভাড়ার চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে।
এইচ এম বিপ্লব নামে এক যাত্রী জানান, জরুরি প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে বৃষ্টিতে বাইরে বের হয়েছিলেন তিনি। তবে রিকশার সংখ্য তুলনামূলক কম থাকায় অতিরিক্ত ভাড়া গুণতে হয়েছে তাকে।
দূরন্ত নামে স্থানীয় আরেক বাসিন্দা জানান, প্রয়োজনের তাগিদে ৩০ টাকার পরিবর্তে তাকে ৬০ টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে।
যাত্রীদের দাবি, মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়েছে। তাই নির্দিষ্ট ভাড়ার তালিকা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।
যদিও কয়েকজন রিকশাচালকের দাবি, টানা বৃষ্টিতে যাত্রী কম, রাস্তায় পানি জমে চলাচলে সময় ও পরিশ্রম বেশি লাগছে। সে কারণেই তারা কিছুটা বেশি ভাড়া নিতে বাধ্য হয়েছেন।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে এমন আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে নিম্ন আয়ের মানুষের সংকট আরও বাড়বে। দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর জন্য কয়েক দিন কর্মহীন থাকা মানেই খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে সংকট তৈরি হওয়া। তাই ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন আয়ের মানুষের পাশে থাকতে সরকারি ফান্ড থেকে সহায়তার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের জেলার সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য জিল্লুর রহমমান ভিটু বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের সহায়তার জন্য সরকারি আপদকালীন তহবিল রয়েছে। সেখান থেকে নিম্ন আয়ের মানুষকে সহায়তা করা হলে তারা কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্তরা আশা করছেন, আবহাওয়ার উন্নতি হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং তারা আবার নিয়মিত কাজে ফিরতে পারবেন। তবে বৃষ্টি দীর্ঘায়িত হলে নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ ও অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা নিম্ন আয়ের মানুষের।

