বাংলার ভোর প্রতিবেদক
মৌসুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই যশোরসহ দেশের বিভিন্ন বাজার ভরে উঠেছে আম ও লিচুতে। টকটকে হলুদ আম আর লালচে লিচুর বাহারি রূপে আকৃষ্ট হয়ে ক্রেতারা কিনছেন চড়া দামে। তবে কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বাজারে থাকা অধিকাংশ আম ও লিচুই অপরিপক্ব। কেমিক্যাল ব্যবহার করে দ্রুত পাকিয়ে বাজারজাত করায় একদিকে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি।
সরকার ঘোষিত ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী এখন মূলত সাতক্ষীরার কিছু স্থানীয় জাতের আম বাজারে থাকার কথা। কিন্তু যশোরের বাজারে ইতোমধ্যে হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, গোলাপখাসসহ বিভিন্ন উন্নত জাতের আম বিক্রি হচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এসব আমের বড় অংশই সময়ের আগেই গাছ থেকে নামিয়ে কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো হচ্ছে।
যশোর শহরের মুজিব সড়ক, দড়াটানা, মণিহার ও পালবাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মে মাসের শুরুতেই বাজারে উঠেছে গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া ও আম্রপালি। অনেক বিক্রেতা দাবি করছেন, এসব আম রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই অঞ্চলের অধিকাংশ আম এখনো পরিপক্ব হওয়ার সময় হয়নি।
চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন ৫ মে থেকে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, গোলাপখাস, বৈশাখী ও বোম্বাই জাতের আম সংগ্রহের অনুমতি দিয়েছে। একই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৫ মে থেকে হিমসাগর ও ক্ষিরসাপাত, ২৭ মে থেকে ল্যাংড়া এবং ৫ জুন থেকে আম্রপালি সংগ্রহের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
সাতক্ষীরার আম ব্যবসায়ী ইয়াহিয়া হাসান বলেন, এ বছর সাতক্ষীরায় আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন শহরের বাজার এখন অপরিপক্ব আমে সয়লাব। এতে সাতক্ষীরার আমেরও বদনাম হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী কাঁচা আম সংগ্রহ করে কেমিক্যাল দিয়ে পাকিয়ে বাজারে ছাড়ছেন।
রাজশাহী জেলা প্রশাসনের ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গোপালভোগ বাজারে আসার সময় ২২ মে, হিমসাগর বা ক্ষিরসাপাত ৩০ মে এবং ল্যাংড়া ১০ জুন। নওগাঁয় গোপালভোগ সংগ্রহ শুরু হবে ৩০ মে, হিমসাগর ২ জুন এবং ল্যাংড়া ১০ জুন থেকে। অথচ এখনই বাজারে এসব জাতের আম বিক্রি হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে এর প্রকৃত মান নিয়ে।
শুধু আম নয়, মৌসুমের আগেই বাজারে দেখা মিলছে লিচুরও। দিনাজপুর ও পাবনার বিখ্যাত লিচু বাজারে আসতে এখনো কয়েকদিন বাকি থাকলেও যশোরের বাজারে নানা জাতের লিচু বিক্রি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব লিচুর বেশির ভাগই অপরিপক্ব।
সার্কিট হাউজ পাড়ার বাসিন্দা সবদুল মিয়া বলেন, সুন্দর রং দেখে পরিবারের জন্য আম কিনেছিলাম। বাসায় কেটে দেখি ভেতরে কাঁচা। রাতে বাচ্চার পেটব্যথা শুরু হয়। পরে বুঝেছি আমটা স্বাভাবিকভাবে পাকেনি।”
কোতয়ালী থানার পাশে কথা হয় রাফসান জনির সঙ্গে। তিনি বলেন, জানি এখনকার আম ভালো হওয়ার কথা না, তারপরও লোভ সামলাতে পারিনি। কেজি ১২০ টাকা দিয়েও ভালো আম পেলাম না।”
বর্তমানে বাজারে আগাম আম বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। অন্যদিকে লিচুর প্রতি ছড়া বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরুতে বেশি দামে বিক্রির সুযোগ নিতে একশ্রেণির ব্যবসায়ী অপরিপক্ব ফল সংগ্রহ করছেন। পরে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথোফেনসহ বিভিন্ন রাইপেনিং কেমিক্যাল ব্যবহার করে দ্রুত পাকিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে।
গত ২৯ এপ্রিল সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ কেমিক্যাল ও কার্বাইড দিয়ে পাকানো প্রায় ৯ হাজার কেজি অপরিপক্ব আম জব্দ করে। একইভাবে শার্শার বেলতলা আম বাজারেও নির্ধারিত সময়ের আগেই হিমসাগর আম বিক্রি হতে দেখা গেছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, প্রতিটি ফলের নির্দিষ্ট পরিপক্বতার সময় রয়েছে। সময়ের আগে ফল সংগ্রহ করলে ভেতরে স্বাভাবিক শাঁস তৈরি হয় না। ফলে বাইরে পাকা দেখালেও ফলের গুণগত মান ঠিক থাকে না।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামসুল আমিন বলেন, ‘বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করে অপরিপক্ব ফল পাকানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে প্রাথমিকভাবে বমি, ডায়রিয়া ও পেটের সমস্যা হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে লিভার ও কিডনির ক্ষতির পাশাপাশি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ে।” তিনি আরও বলেন, “অপরিপক্ব লিচু বিশেষ করে শিশুদের জন্য বিপজ্জনক। খালি পেটে এসব লিচু খেলে রক্তে গ্লুকোজ কমে গিয়ে মস্তিষ্কে জটিলতা তৈরি হতে পারে।’
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, অতিরিক্ত চকচকে, অস্বাভাবিক উজ্জ্বল বা গন্ধহীন ফল কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। ফল খাওয়ার আগে কিছু সময় পানিতে ভিজিয়ে রেখে ভালোভাবে ধুয়ে নেয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু প্রশাসনিক অভিযান নয়, চাষি, আড়তদার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা-সবার মধ্যে সচেতনতা তৈরি না হলে অপরিপক্ব ও কেমিক্যালযুক্ত ফলের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
