বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
গরমে তৃষ্ণা মেটাতে যশোর শহরের ফুটপাত ও সড়কের পাশের আখের রসের দোকানে বাড়ছে জনসাধারণের ভিড়। দড়াটানা, চৌরাস্তা, মুজিব সড়ক, মনিহার, রেলগেট, পালবাড়ী ও খড়কি এলাকায় পথচারী থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঠান্ডা এ আখের রস পান করছেন।
কম দামে দ্রুত তৃষ্ণা মেটানো গেলেও এই পানিয় তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে রস ঠান্ডা করতে ব্যবহৃত বরফের উৎস ও মান, অপরিস্কার পানি, খোলা পরিবেশ এবং অতিরিক্ত মিষ্টির জন্য স্যাকারিন ব্যবহারের অভিযোগে উঠেছে।
যশোর শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের পাশে ভ্যানের উপরে মেশিন বসিয়ে আখ রেখে রস তৈরি করছেন বিক্রেতারা। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী মেশিনে আখ ঢুকিয়ে রস বের করে গ্লাসে দেওয়া হচ্ছে। এরপর ঠান্ডা করার জন্য সরাসরি রসের মধ্যে দেয়া হচ্ছে বরফ।
দড়াটানা এলাকায় একটি আখের রসের দোকানে দেখা যায়, রাস্তার ধারে খোলা অবস্থায় আখ রাখা হয়েছে। পাশ দিয়েই চলছে যানবাহন। বাতাসে উড়ছে ধুলাবালি। একই জায়গায় রাখা হয়েছে রস তৈরির মেশিন, গ্লাস ও বরফ। রস তৈরির পর ক্রেতার হাতে দেয়ার আগে গ্লাসে বরফ দেয়া হচ্ছে।
মুজিব সড়ক ও চৌরাস্তা এলাকার কয়েকটি দোকানেও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও বরফ সরাসরি রসে মেশানো হচ্ছে। আবার কোথাও বরফ রাখা পাত্রের সাহায্যে রস ঠান্ডা করা হচ্ছে। কিন্তু বরফ কোথায় তৈরি হয়েছে, কি পানি ব্যবহার করা হয়েছে কিংবা আগে সেটি মাছ সংরক্ষণ বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহৃত হয়েছে কি না-এ বিষয়ে বিক্রেতাদের অধিকাংশই নিশ্চিত নন।
একাধিক বিক্রেতা জানান, তারা নিজেরা বরফ তৈরি করেন না। স্থানীয় বরফ বিক্রেতা কিংবা আশপাশের বিভিন্ন জায়গা থেকে কম দামে বরফ কিনে আনেন। বরফের মান পরীক্ষা করার কোনো ব্যবস্থা তাদের নেই।
দড়াটানা এলাকার বিক্রেতা জাফর সেখ বলেন, ‘আমরা বড় বাজার থেকে বরফ কিনে আনি। বরফ কোথায় তৈরি হয়, সেটা সব সময় জানা থাকে না। যে জায়গা থেকে সহজে পাওয়া যায়, সেখান থেকেই নিয়ে আসি। ক্রেতারা ঠান্ডা রস চান, তাই বরফ ব্যবহার করতে হয়।’
আরেক বিক্রেতা আলিম হোসেন বলেন, ‘বরফ ছাড়া গরমের সময় রস বিক্রি করা কঠিন। মানুষ ঠান্ডা রস খেতে চায়। তাই বরফ কিনতে হয়।’
কয়েকজন বিক্রেতার ভাষ্য, মাছের আড়ত বা মাছ পরিবহনে ব্যবহৃত বরফও বিভিন্ন সময় বাজারে পাওয়া যায়। তবে সেই বরফ পানিয়তে ব্যবহারের উপযোগী কি না, তা তারা পরীক্ষা করেন না।
মণিহার মোড়ে এক দোকানে আখের রস পান করছিলেন দুই শিক্ষাথী। অভিযোগ করে ফারিয়া আক্তার বলেন, ‘আখের রসে অতিরিক্ত মিষ্টি করার জন্য স্যাকারিন ব্যবহার করা হচ্ছে। যা শরীরে জন্য ক্ষতিকর। দোকানগুলোতে এ বিষয়ে বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন।’
একই বিষয়ে বলেন তার বন্ধবী ফায়জা জান্নাত। তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিকভাবে আখের রস মিষ্টি। এর সঙ্গে বাড়তি মিষ্টি করার জন্য কোনো উপাদান মেশানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু রাস্তা ঘাটে অতিরিক্ত মিষ্টির আখের রস পাওয়া যাচ্ছে।
যশোর মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার ফজলুল হক খালিদ বলেন, ‘আখের রস তৈরির ক্ষেত্রে শুধু আখ পরিস্কার থাকলেই হবে না। রস তৈরির মেশিন, পানি, বরফ, গ্লাস ও পরিবেশ-সবকিছু স্বাস্থ্যসম্মত হতে হবে। অপরিস্কার পানি বা দূষিত বরফ ব্যবহারের মাধ্যমে জীবাণু পানিয়তে চলে যেতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘আখের রস সাধারণত ফুটিয়ে পরিবেশন করা হয় না। ফলে পানিতে বা বরফে জীবাণু থাকলে তা রসের সঙ্গে সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। একইভাবে অপরিস্কার মেশিন, গ্লাস ও বিক্রেতার হাত থেকেও রস দূষিত হতে পারে। এতে বিশেষ করে ডায়রিয়া, বমি, পেটের বিভিন্ন অসুখসহ খাদ্য ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর ফলে মানুষ হেপাটাইটিস এ ও ই আক্রান্ত হয় বেশি।’
