শরিফুল ইসলাম :
দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ ৩৬ শিশুর মরদেহ পাওয়া গেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণে এ ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
এক সাথে শিশুদের ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতন এবং পারিবারিক সহিংসতায় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে উল্লেখযোগ্যহারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, শুধু নিখোঁজ হওয়ার পর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাই নয়—চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে জিডি হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা ফিরে এসেছে। সেই হিসাবে ওই সময় পর্যন্ত ২ হাজার ৩৮ শিশু নিখোঁজ ছিল।
তবে নিখোঁজের তথ্য পরবর্তী সময়ে হালনাগাদ না হওয়ায় এই সংখ্যায় কিছুটা বিভ্রান্তির সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ। আসকের হিসাবে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধার হওয়া ৩৬ শিশুর পাশাপাশি বিভিন্ন ঘটনায় মোট ২৫৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্য তাদের পর্যবেক্ষণে এসেছে।
এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, পারিবারিক পরিসরে সহিংসতা, ধর্ষণের পর হত্যা, গুলি এবং অন্যান্য সহিংসতার ঘটনা রয়েছে।
একের পর এক নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধার :
সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি ঘটনা শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সর্বশেষ কুমিল্লায় ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে বিভিন্ন ঘটনায় নিখোঁজ শিশুদের কারও মরদেহ মাটিচাপা অবস্থায়, আবার কারও মরদেহ নদী বা জলাশয় থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
পাবনা সদরে ১০ বছরের এক শিশু ৯ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হওয়ার সাত দিন পর একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের একটি শিশু ১০ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি। দুই দিন পর সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আট মাসে শিশু মৃত্যুর ভয়াবহ চিত্র :
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) আসকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় ১৫৫ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে—যার মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে ৬৮, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে ৪৯, ধর্ষণের পর হত্যা ২৬, ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা ৪, গুলিতে ৩, গৃহকর্মী হিসেবে শারীরিক নির্যাতনে ২, উত্ত্যক্তকারীর হাতে ২ এবং অপহরণের পর হত্যার ঘটনা ১টি।
এর বাইরে আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনাও আসকের পর্যবেক্ষণে এসেছে। এ ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে একই ঘটনায় কয়েকজন শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর, রংপুর, মাদারীপুরের শিবচর এবং সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শিশু হত্যার
ঘটনা সামনে এসেছে। নিরাপত্তা কোথায় ?
শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার না হলে তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে—সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফও। সংস্থাটি শিশুদের জন্য ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রতিটি পরিসরে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
একই সঙ্গে শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। আসক বলছে, নিখোঁজ হওয়ার পর কোনো শিশুর মরদেহ উদ্ধারকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কীভাবে শিশুটি নিখোঁজ হলো, উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, কোথাও অবহেলা বা সমন্বয়হীনতা ছিল কি না এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। সংস্থাটি নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ে সমন্বিত ও নিয়মিত হালনাগাদ জাতীয় তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে।
তাদের মতে, নিখোঁজ, উদ্ধার এবং এখনো নিখোঁজ শিশুদের প্রকৃত চিত্র জানা গেলে ঝুঁকির ধরন শনাক্ত করে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। শিশু নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধারের ধারাবাহিক ঘটনা তাই শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, দ্রুত অনুসন্ধান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয় এবং সামাজিক সচেতনতার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনছে।
