প্রবাস বাংলা ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিতর্কিত মন্তব্য নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের এক সিনিয়র কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের একটি অংশ হলো ইরানের বিশাল তেল মজুদের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেয়া। এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দখলদার ইসরাইলের হামলা ও ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পুরো অঞ্চল জুড়ে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দখলদার ইসরাইল ইরানের সামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালায়। এর জবাবে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তু এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। সংঘাত দ্রুত সীমান্ত অতিক্রম করে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। গোলান মালভূমিতে ইসরাইলি অবস্থানে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলা এবং বাগদাদে মার্কিন স্থাপনায় রকেট হামলার খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এ উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই হোয়াইট হাউসের ন্যাশনাল এনার্জি ডমিনেন্স কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক জ্যারড অ্যাজেন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ইরানের বিশাল তেলের মজুদ সন্ত্রাসীদের হাত থেকে কেড়ে নেয়া।
তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তিগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগকে আরও জোরালো করে যে-এই অঞ্চলে হস্তক্ষেপের পেছনে মূলত প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন জড়িত।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রমাণিত তেল মজুদের যোগানদাতা। ফলে দেশটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করার চেষ্টা করেছে। তবে সাম্প্রতিক মন্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ওয়াশিংটনের কিছু নীতিনির্ধারক এখন আরও বিস্তৃত কৌশল নিয়ে ভাবছেন, যেখানে জ্বালানি সম্পদের ওপর প্রভাব বিস্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এদিকে সংঘাতের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালীতে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। সামরিক উত্তেজনা ও হামলার কারণে অনেক জাহাজ কোম্পানি এই পথে চলাচল সীমিত বা স্থগিত করেছে। কয়েকটি ট্যাঙ্কার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বীমা কোম্পানিগুলোও ঝুঁকি কমাতে কভারেজ প্রত্যাহার করতে শুরু করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।
সংঘাতের নিহতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, হামলা শুরুর পর থেকে এক হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই হামলার তদন্ত এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সংঘাত এখন আর কেবল ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক জোট এতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার প্রকাশ্য সমর্থন, চীনের সম্ভাব্য কূটনৈতিক তৎপরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই সংঘাত ভবিষ্যতে বৈশ্বিক রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই বাড়বে মানবিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা-যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো বিশ্বকেই বহন করতে হতে পারে।
বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের হামলা
বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। বাহরাইনে জুফায়র ঘাঁটি লক্ষ্য করে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।
আইআরজিসি বলেছে, কেশমের একটি পানির প্ল্যান্টের ওপর মার্কিন হামলার জবাবে হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এর আগে বলেছিলেন, ওই মার্কিন হামলায় ৩০টি গ্রামের পানি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করেছে।
বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ বলছে, হামলার সময় সাইরেন বেজে উঠেছে। বাসিন্দাদের শান্ত থাকার এবং নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
