আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা সাজানো ভূ-রাজনীতি আজ এক গভীর খাদের কিনারায়। ইরানের নজিরবিহীন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের অনিচ্ছাসত্ত্বেও এমন এক যুদ্ধের ভেতরে টেনে এনেছে, যা তারা যেকোনও মূল্যে এড়াতে চেয়েছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং সৌদি আরবের মতো দেশগুলো এখন সরাসরি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধে জড়ানোর মুখে। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান ছাড়াই ইরানবিরোধী একটি আরব-ইসরায়েল অক্ষ তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই কাঙ্ক্ষিত জোট যখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে, তখনই পুরো অঞ্চল এক ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। মার্কিন সাময়িকী ফলেন পলিসির এক বিশ্লেষণে এমন পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে।

গত তিন বছরে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে আপস ও স্থিতিশীলতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সংঘাত তা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। অথচ এক সময় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান নিজেই ইরানের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালে সৌদি তেল শোধনাগারে ইরানের নিখুঁত হামলা এবং পরবর্তীতে আবুধাবিতে ড্রোন হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলো রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। তারা বুঝতে পারে, বিপদের সময় যুক্তরাষ্ট্র তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় যথেষ্ট নয়। ফলে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়, যা ছায়া যুদ্ধের উত্তাপ কমিয়েছিল।

কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে ক্ষমতা পরিবর্তনের লক্ষ্যে সর্বাত্মক হামলার ছক কষেছে, তখন ইরানও পিছু হটার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ওমানি মধ্যস্থতাকারীরা যখন দেখলেন ট্রাম্প প্রশাসন আলোচনার কোনও সদিচ্ছাই দেখাচ্ছে না, তখন যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। উপসাগরীয় দেশগুলো আশা করেছিল যুদ্ধ সংক্ষিপ্ত হবে এবং ইরানের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর কোনও বাস্তববাদী স্বৈরশাসক আসবে। কিন্তু তেহরান সেই চিত্রনাট্য প্রত্যাখ্যান করে সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি প্রতিবেশীকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।

মিডিয়াতে ইরানের হামলাকে ‘বিচ্ছিন্ন সহিংসতা’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি গভীর সুচিন্তিত কৌশল। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনকে মূল লক্ষ্য বানালেও কাতার, ওমান এমনকি সৌদি আরবও ইরানের হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রাণকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ইরান তাদের জনগণকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, তারা কতটা অরক্ষিত। স্থানীয় শপিং মল বা জনসমাগমস্থলে রাষ্ট্রপ্রধানদের সশরীরে উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের মনে কতটা আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

ইরানের এই রণকৌশলের মূল লক্ষ্য বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্রুত আঘাত হেনে যুদ্ধবিরতির চাপ তৈরি করা। কোনও বিশেষ প্রচেষ্টা ছাড়াই কেবল হুমকির মুখে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে গেছে। প্রত্যক্ষ হামলা ছাড়াই সৌদি তেল শোধনাগার এবং কাতারের এলএনজি উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে। আকাশছোঁয়া জ্বালানি তেলের দামের মুখে যুক্তরাষ্ট্রও আজ দিশেহারা। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, শাহেদ ড্রোন ও সস্তা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইরান পশ্চিমের ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। প্রাথমিক সফলতায় ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র উল্লাস করলেও ইন্টারসেপ্টর ফুরিয়ে গেলে আসল বিপর্যয় শুরু হবে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা হলো ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর তাদের অগাধ বিশ্বাসের প্রতিফলন না ঘটা। এই দেশগুলো ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক আগ্রহ এবং স্বৈরতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রতি মুগ্ধ ছিল। কিন্তু এখন তারা বুঝতে পারছে, তাদের টিকে থাকার জন্য জরুরি এমন এক যুদ্ধ শুরু করার আগে ওয়াশিংটন তাদের সঙ্গে কোনও কার্যকর পরামর্শই করেনি। ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার যে মার্কিন-ইসরায়েলি পরিকল্পনা, তার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া থেকে এই আরব দেশগুলো মুক্ত থাকতে পারবে না। মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন তাদের জন্য নিরাপত্তার বদলে উল্টো বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে দুবাই বা রিয়াদের মতো আধুনিক শহরগুলোর বাসিন্দারা ভাবতেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা কেবল সিরিয়া, সুদান বা ইয়েমেনিদের জন্য, তাদের জন্য নয়। কিন্তু ইরান সেই বিভ্রম ভেঙে দিয়েছে। ইরান যদি এই যুদ্ধে টিকে যায়, তবে তারা এই জবরদস্তিমূলক শক্তির কথা মনে রাখবে। আর যদি ইরানের পতন ঘটে, তবে শরণার্থী স্রোত, উগ্রবাদ আর অস্থিতিশীলতায় পুরো উপসাগর অস্থির থাকবে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের এই আক্রমণ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার সাম্প্রতিক দ্বন্দ্বকে সাময়িকভাবে থামিয়ে দিয়েছে। আস্তিত্বের সংকটে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এক কাতারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় অংশগ্রহণ আরব দেশগুলোকে আতঙ্কিত করছে। তারা ভাবছে, আজ ইরান হলে কাল হয়তো তাদেরই পালা। আর এই গভীর নিরাপত্তাহীনতাই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের সাজানো সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ার পূর্বাভাস দিচ্ছে।

Share.
Exit mobile version