রেহেনা ফেরদৌসী
ঈদ মানেই আনন্দ, মিলন, ভালোবাসা আর পরিবারের সঙ্গে কাটানো কিছু অমূল্য সময়। ঈদের ছুটি, আনন্দের সময়, পরিবার-পরিজনের সাথে মিলে এক হওয়ার সময়। কিন্তু এই আনন্দের ছায়ায় কিছু মানুষ আছে, যারা এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত। তারা হলেন বৃদ্ধাশ্রমের মানুষগুলো।তাদের মন তাদের পরিবারের জন্য পড়ে রয়েছে, কিন্তু তারা তাদের সাথে নেই।

চাঁদ দেখা থেকে শুরু করে ঈদের নামাজ, সেমাই-পোলাওয়ের সুগন্ধ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে হাসি-আড্ডায় ভরে ওঠে প্রতিটি ঘর। কিন্তু এই উৎসবের উজ্জ্বলতার আড়ালে, সমাজের এক কোণে নীরবে জমে ওঠে কিছু অদৃশ্য বেদনা—বৃদ্ধাশ্রমে বসবাসরত অসংখ্য প্রবীণ মানুষের হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকে নিঃসঙ্গতার কষ্ট।ঈদের ছুটিতে যখন আপন মানুষগুলো ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজেদের পরিবার নিয়ে, তখন অনেক বৃদ্ধ মা-বাবা আশ্রমের ছোট্ট একটি কক্ষে বসে অপেক্ষা করেন—হয়তো একটি ফোনকল, হয়তো একটি দেখা হবে, কিংবা একটি আন্তরিক খোঁজখবরের জন্য। আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর ঘিরে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছেন অসংখ্য মানুষ। ঈদের সকালে ঘরে ঘরে নতুন পোশাক, অতিথি আপ্যায়ন, কোলাহল আর হাসির উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠবে বাড়ির আঙিনা। কিন্তু এই উৎসবের দিনটিতে বৃদ্ধাশ্রম হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গতার আরেক নাম। সেখানে ঈদ মানে স্মৃতির ভেতর ডুবে থাকা আর চুপচাপ কেটে যাওয়া কয়েকটি দিন।ঈদ এলেই মনে পড়ে যায় আগের দিনের কথা। বাড়িতে কত আয়োজন থাকত, কত মানুষ আসত। এখন সবই শুধু স্মৃতি। অথচ তাদের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সময় কারও বাবা-মা ছিলেন, পরিবার গড়ে তুলেছিলেন নিজের শ্রম আর ত্যাগে। তাদের জীবন একসময় ঘিরে ছিল যাদের হাসি, স্নেহ আর কোলাহলে, আজ তারাই দূরে—নিজ নিজ জীবনের ব্যস্ততায়। এই মানুষগুলো এক সময় পরিবারের জন্য সব করেছেন।হৃদয়ের হাহাকারে শুধু মনে মনে ভাবেন,যদি আবার সেই দিনগুলো ফিরে পেতাম! ফলে উৎসবের এই দিনে আনন্দের চেয়ে তাদের মনে বেশি জাগে শূন্যতা আর না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। ঈদের দিনে যখন সবাই পরিবার-পরিজনের সাথে মিলে এক হয়, তখন বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে যথেষ্ট আদর, সম্মান বা ভালোবাসা দেওয়ার পরও তাদের মনস্তাত্ত্বিক কষ্টটা, মানসিক টানাপোড়েন এবং পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এটিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

তারা ভাবে, “আমি কি তাদের জন্য কিছুই না? আমাকে কি তারা একবারও মনে করে না?”
বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে ঈদের দিন বিশেষ আয়োজন থাকলেও, আদর-আপ্যায়ন কিংবা উপহার দিয়ে যে অভাব পূরণ করা যায় না, তা হলো নিজের পরিবারের সান্নিধ্য। বাইরের মানুষজনের দেওয়া ভালোবাসা যতই আন্তরিক হোক, রক্তের সম্পর্কের যে টান, তা কোনো কিছুর মাধ্যমেই প্রতিস্থাপন সম্ভব নয়। ফলে বাহ্যিক হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীর মানসিক টানাপোড়েন।পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এই সমস্যাটাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরনের বিচ্ছিন্নতা প্রবীণদের মধ্যে হতাশা, একাকীত্ব এবং আত্মমর্যাদাবোধের ক্ষয় ডেকে আনে। তারা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় মনে করতে শুরু করেন, যা ধীরে ধীরে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ঈদের মতো আবেগঘন সময়ে এই অনুভূতিগুলো আরও তীব্র হয়ে ওঠে।এই চিত্র আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধের ক্রমাবনতির দিকেও ইঙ্গিত করে। একসময় যেখানে যৌথ পরিবার ছিল আমাদের সংস্কৃতির মূল ভিত্তি, সেখানে এখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারা প্রবল হয়ে উঠছে। ব্যস্ততা, নগরজীবনের চাপ এবং আধুনিকতার অজুহাতে আমরা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছি আমাদের শিকড় থেকে—যেখানে তাদের প্রতি দায়িত্ব ও ভালোবাসা ছিল অগ্রগণ্য।

তবে এই বাস্তবতা পরিবর্তন করা অসম্ভব নয়। ঈদের আনন্দ তখনই পরিপূর্ণ হয়, যখন তা সবার মাঝে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তাই এই উৎসবে আমাদের উচিত বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রবীণদের পাশে দাঁড়ানো—একটু সময় দেওয়া, তাদের সঙ্গে কথা বলা, তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া। বৃদ্ধাশ্রমের মানুষগুলো তাদের জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাচ্ছেন একা, পরিবার-পরিজনের ছাড়া। হয়তো আমাদের এই সামান্য উদ্যোগই তাদের হৃদয়ে ফিরিয়ে আনতে পারে হারিয়ে যাওয়া ঈদের আনন্দের একটুখানি আলো।

ঈদ কেবল আনন্দের নয়, এটি দায়িত্ব, ভালোবাসা এবং মানবিকতারও উৎসব—এই উপলব্ধি ছড়িয়ে পড়ুক সমাজের প্রতিটি স্তরে।

Share.
Exit mobile version