বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
কুমিল্লার লালমাইয়ে ধান খেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৩) মরদেহ যশোরে দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার বেলা১১টার দিকে যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাদার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে তাজমিনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন তার বাবা-মা। তাজমিনের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ায় তাজমিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ হয়ে আছেন তার মা-বাবা ও স্বজনেরা। সাংবাদিকেরা ছবি তুলতে গেলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাজমিনের মা কেয়া খাতুন। তিনি বলেন, ‘কী হবে এসব ছবি তুলে! আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে, এখন আর কিছু বলব না।’
পরে মেয়ের সঙ্গে শেষবার কথা বলার স্মৃতি তুলে ধরে কেয়া খাতুন বলেন, ‘আমার পাখির সঙ্গে সবশেষ গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কথা হয়। তখন সে বলে, আমি আমার বান্ধবীর বাড়িতে আছি, নিয়ে যাও। তখন আমি তাকে প্রশ্ন করি, তোর সেই বান্ধবীর নাম কী? বাবা-মায়ের নাম কী? তখনো সে কিছু বলেনি।’
তাজমিনের মা ওই বান্ধবীর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তার দাবি, ওই বান্ধবীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মেয়ের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম কুমিল্লা শহরের একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন।
মেয়েকে হারিয়ে তিনিও ভেঙে পড়েছেন। তিনি বলেন, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। এরপর বিভিন্ন সময়ে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বান্ধবীর বাসায় আছে বলে জানায়। আবদুল আলীম বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক পৌনে দুইটার দিকে সে আমাকে মেসেজ ও লাইভ লোকেশন পাঠায়।
মেসেজে এসে তাকে নিয়ে যেতে বলে। তখন আমি ঘুমে ছিলাম। পরে সকালে মেসেজ দেখি। এরপর লাইভ লোকেশনে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে দেখতে পাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে চাই না। আমার মেয়ের সঙ্গে কী হয়েছে, কারা তাকে হত্যা করেছে, পুরো ঘটনা জানতে চাই। জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করার দাবি জানাই।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাজমিন তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিল। সে মেধাবী ছিল। বিভিন্ন ছুটিতে বাবা-মায়ের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসত। তার মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
পুলিশের অনুসন্ধান অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বাড়ি থেকে বের হওয়ার পরও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল তাজমিন। সে কুমিল্লা থেকে কক্সবাজারে যায়। বুধবার দুপুরের পর কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এরপর পদুয়ার বাজার থেকে কীভাবে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার ধান খেতে পৌঁছায়, তা তদন্ত করছে পুলিশ। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, নূরজাহান হোটেল থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
পাশাপাশি সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির বিষয়েও তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা অটোরিকশা ধরে তদন্ত এগোচ্ছি।’ বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধান খেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল বলে জানিয়েছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুজ্জামান।
এসপি বলেন, ঘটনাস্থলের অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধান খেতে দৌঁড়াদৌঁড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলের অবস্থা দেখে মনে হয়েছে, তাজমিন জীবন বাঁচাতে হামলাকারীদের হাত থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিল। এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।
এদিকে, কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার দুপুরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার পর থেকে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বিষয়টি নিশ্চিত করেন কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. লুৎফর রহমান। লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, এ ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থীর বাবা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার সুমনকে কুমিল্লায় আনার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
