ইমরান হোসেন পিংকু
যশোরের রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে বাড়তি চাপে বেড়েছে সংসার খরচে। সরকারি নির্ধারিত দামে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়ার কথা ১ হাজার ৮৩৭ টাকায়। অথচ বাজারে তা কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়।
অর্থাৎ একটি সিলিন্ডারে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ২৬৩ থেকে ৩৬৩ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পছন্দের ব্র্যান্ডের গ্যাস না পাওয়ার ভোগান্তি। খালি সিলিন্ডার নিয়ে দোকানে গিয়েও অনেকে ফিরছেন হতাশ হয়ে। বাধ্য হয়ে কেউ কিনছেন অন্য ব্র্যান্ডের গ্যাস, আবার কেউ নতুন সিলিন্ডার কেনার বাড়তি খরচ এড়াতে ঝুঁকছেন বৈদ্যুতিক চুলায়।
বাজারে গ্যাসের বাড়তি দামের সঙ্গে নিত্যপণ্যের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা। যেসব পরিবারে আগে থেকেই বৈদ্যুতিক চুলা রয়েছে, তারা এখন সেটির ব্যবহার বাড়াচ্ছেন। আবার অনেকে নতুন করে কিনছেন ইলেকট্রিক চুলা। তাদের আশঙ্কা, গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে না এলে রান্নার খরচ আরও বাড়বে।
সরকার চলতি মাসে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে নির্ধারিত দামে গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে ক্রেতাদের।
ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, ডিলার পর্যায়েই বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ যোগ করে বিক্রি করায় সরকারি দামের সঙ্গে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, ক্রেতাদের অভিযোগ, বাড়তি দামের কারণে তাদের সংসারের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
দামের পাশাপাশি এলপিজির ব্র্যান্ডভিত্তিক সরবরাহেও সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বসুন্ধরা ও বেক্সিকোর মতো কয়েকটি কোম্পানির সিলিন্ডার না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন নিয়মিত গ্রাহকেরা। খালি সিলিন্ডার নিয়ে দোকানে গিয়েও পছন্দের ব্র্যান্ড না পেয়ে অনেকে অন্য কোম্পানির গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার নতুন সিলিন্ডারসহ গ্যাস কিনতে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ টাকা লাগায় অনেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
বসুন্ধরা ব্র্যান্ডের যশোরের ডিলার এসএম নুরউদ্দিন জানান, গত মাসের ১৮ তারিখ থেকে তিনি কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে তার ব্যবসায়িক পুঁজি আটকে রয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত গ্রাহকদের অন্য কোম্পানির সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে, যা তাদের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
সেনা, পেট্রোম্যান্ড ও জি গ্যাসের যশোরের ডিলার ফিরোজ আহমেদ বলেন, তারা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ১২ কেজির সিলিন্ডার সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮২০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। কোম্পানি থেকে গ্যাস কেনা, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মেটানোর পর তাদের মুনাফা সীমিত।
বাজারে সরবরাহ কম থাকায় খুচরা বিক্রেতারাও আগের মতো গ্যাস পাচ্ছেন না।
ধর্মতলা এলাকার খুচরা গ্যাস বিক্রেতা মফিজ হোসেন বলেন, ডিলারদের কাছ থেকে সরকারি নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। পরে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ যোগ করে ভোক্তা পর্যায়ে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।
পালবাড়ি এলাকার খুচরা বিক্রেতা আনিসুর রহমান বলেন, আমরা বেশি দামে গ্যাস কিনছি। তাই পুঁজি ও প্রতিদিনের খরচ হিসাব করে বিক্রি করতে হচ্ছে।
বিকল্প চুলায় বাড়ছে নির্ভরতা
এলপিজির বাড়তি দাম ও সরবরাহের অনিশ্চয়তায় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। আগে থেকে বৈদ্যুতিক চুলা থাকা পরিবারগুলো এখন সেটি বেশি ব্যবহার করছে। পাশাপাশি নতুন করে চুলা কিনতেও দোকানে আসছেন অনেকে।
যশোরের বড়বাজারে বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে আসা লিটন হোসেন বলেন, বুধবার সকালে গ্যাস শেষ হয়ে যায়। দোকানে ফোন করে গ্যাসের দাম বেশি জানতে পারি। পরে বাধ্য হয়ে গ্যাসের বদলে বৈদ্যুতিক চুলা কিনে এনেছি।
গৃহিণী শারমিন সুলতানা বলেন, প্রতি মাসে আমার একটি গ্যাস সিলিন্ডার লাগে। যেভাবে দাম বাড়ছে, তাতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছি। তিনি বলেন, কয়েক হাজার টাকা খরচ করে নতুন সিলিন্ডার কেনার চেয়ে আপাতত বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করাকে সুবিধাজনক মনে হচ্ছে।
যশোর জেলা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. সেলিমুজ্জামান জানিয়েছেন, খুচরা বিক্রেতারা ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। এ কারণে পরিবহন খরচসহ সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০ থেকে ৫০ টাকা বেশি নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, গত ৫ তারিখে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এ বিষয়ে সভা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
