বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
ক্ষমতাসীনদের প্রভাব ও রাজনৈতিক আশ্রয়ে মুক্তেশ্বরী নদী দখল হয়ে আছে। দখলদারদের মধ্যে কেউ পতিত আওয়ামী লীগ সরকারে সংসদ সদস্য, কেউ আবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মুক্তেশ্বরী নদী দখলমুক্ত করার দাবি উপেক্ষিত হচ্ছে। তারা ক্ষমতায় থেকে নদীর শ্রেণি পরিবর্তন করে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নামে দখল করে রেখেছেন। সোমবার বিকেলে মুক্তেশ্বরী নদী বাঁচাও আন্দোলনের পদযাত্রা কর্মসূচি পালনের আগে অনুষ্ঠিত সমাবেশে এ কথা বলেন ভবদহ জলাবদ্ধতা নিরসন আন্দোলন কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ। অভিযোগ তুলে মুক্তেশ্বরী নদী দখলমুক্ত করা, উজানে ভৈরব দের সঙ্গে এর সংযোগ পুনঃস্থাপন এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জানান তিনি।
বিকেল সাড়ে ৫টায় শহরতলীর পুলেরহাটে অবস্থিত আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে থেকে মুক্তেশ্বরী বাঁচাও আন্দোলনের ব্যানারে পদযাত্রাটি শুরু হয়। নদী দখলের অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালের সামনেই কর্মসূচির সূচনা করা হয়। পরে পদযাত্রাটি প্রায় চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে শহরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানা ভৈরব চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় অংশগ্রহণকারীরা নদী দখলমুক্তকরণ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং পরিবেশ রক্ষার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
হাসপাতালের সামনে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মুক্তেশ্বরী নদী বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক অনিল বিশ্বাসের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন, মুক্তেশ্বরী নদী বাঁচাও আন্দোলনের সদস্য সচিব রাশেদ খান, অন্যতম নেতা আহসান উল্লাহ ময়না, ভৈরব আন্দোলনের অন্যতম নেতা জিল্লুর রহমান ভিটু, অন্যতম নেতা হাচিনুর রহমান, জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মাহামুদ হাসান বুলু, উদীচী যশোর জেলা সভাপতি আমিনুর রহমান হিরু এবং অ্যাডভোকেট আবুল কায়েস প্রমুখ।
সমাবেশে ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ক্ষমতার জোরে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মালিক মুক্তেশ্বরী নদী দখল করে রেখেছেন। বহু বছর ধরে আমরা সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও এর কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি। কারণ দখলদারদের কেউ এমপি থাকেন, কেউ আবার উপদেষ্টা থাকেন। তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে নদী রক্ষার দাবি বারবার উপেক্ষিত হয়েছে।
নিউজের ভিডিও দেখতে লিংকে ক্লিক করুন .. .. ..
তিনি আরও বলেন, নদীর শ্রেণি পরিবর্তন করে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের আড়ালে বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। মুক্তেশ্বরী শুধু একটি নদী নয়, এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলপ্রবাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীটি দখলমুক্ত না হলে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
পদযাত্রা শেষে শহরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানা ভৈরব চত্বরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন উদীচী যশোর জেলা সভাপতি আমিনুর রহমান হিরু। তিনি বলেন, একসময় মুক্তেশ্বরী ছিল ভৈরব নদীর একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা এবং অত্যন্ত প্রবাহমান নদী। পুলেরহাট এলাকায় একসময় নৌযান চলাচলের জন্য ঘাটও ছিল। ব্রিটিশ আমলে দর্শনায় চিনিকল স্থাপনের সময় পদ্মা নদীর সঙ্গে মুক্তেশ্বরীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে আসে। পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানে দখল, ভরাট ও অবকাঠামো নির্মাণের ফলে নদীটি আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে।
ভৈরব আন্দোলনের অন্যতম নেতা জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, মুক্তেশ্বরী নদী ভৈরব থেকে উৎপন্ন হয়ে ভবদহের শ্রী, তেলিগাতী, ট্যাংরাইল ও টেকা অঞ্চল অতিক্রম করে শিবসা ও রূপসা নদীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। নদীটির এই প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যবস্থা বর্তমানে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত। ফলে যশোর শহর এবং ভবদহ অঞ্চলে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতি বর্ষা মৌসুমে শত শত গ্রাম পানিতে তলিয়ে যায় এবং দীর্ঘসময় জলাবদ্ধতার মধ্যে বসবাস করতে হয় মানুষকে।
তারা দাবি করেন, মুক্তেশ্বরী নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা গেলে যশোর শহরের জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সমাবেশ থেকে অবিলম্বে মুক্তেশ্বরী নদী দখলমুক্ত করা, আদ্-দ্বীন হাসপাতালসহ নদীর ওপর গড়ে ওঠা সব অবৈধ স্থাপনা অপসারণ, ভৈরব নদীর সঙ্গে মুক্তেশ্বরীর উজানের সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নদী দখলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ভৈরব আন্দোলনের উপদেষ্টা তসলিম-উর-রহমান, ভাসানী পরিষদ যশোর জেলা আহ্বায়ক হারুন অর রশীদ, সদস্য সচিব মুস্তাফিজুর রহমান কবির, বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার রুহুল আমিন, মিজানুর রহমান, সাঈদ আহমদ নাসির শেফার্ড, যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির অন্যতম নেতা রিয়াদুর রহমান ও নওরোজ আলম খান চপল প্রমুখ।
পদযাত্রায় মুক্তেশ্বরী বাঁচাও আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি পরিবেশকর্মী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, নদী রক্ষার এ আন্দোলন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়; এটি যশোর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার আন্দোলন। তারা মুক্তেশ্বরী নদী দখলমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা দেন।

