হিমেল খান
কোরবানী ঈদের বাকি আর ৫ দিন। এরই মধ্যে ব্যস্ততা বেড়েছে কামারশালাগুলোতে। এখন চলছে ব্যস্ত সময়। বেড়েছে লোহার সাথে লোহার আঘাতের টুংটাং শব্দ। যা শুনেই পথচারী থেকে শুরু করে সকলেই মনে দোলা দিয়ে যাচ্ছে কোরবানি সমাগত।

কর্মকাররা বলছেন, ঈদ মৌসুমকে কেন্দ্র করে বেড়েছে কাজের চাপ। শহরের পালবাড়ি, খয়েরতলা, আরবপুর, রেলরোড, উপশহরসহ শহরের বিভিন্ন এলাকা এবং অভয়নগর, চৌগাছা, মণিরামপুরসহ বিভিন্ন উপজেলার কামারপাড়া ঘুরে দেখা গেছে ক্রেতাদের ভিড়ে সরগম কামারশালাগুলো।

আসন্ন কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে কেউ আসছেন নতুন দা, বঁটি চাপাতি বা ছুরি বানাতে। আবার অনেকেই গত বছরের পুরাতন যন্ত্রপাতি শান দিয়ে তা ব্যবহার উপযোগী করে নিচ্ছেন। ফলে কামারশালারগুলোতে একদিকে চলছে নতুন সরঞ্জাম তৈরি, অন্যদিকে পুরাতন সরঞ্জাম ধারালো করার কাজ।

কামারশালার ভেতরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে টুংটাং শব্দ। আগুনে লোহা গরম করা, ভারি হাতুড়ির আঘাতে আকার দেয়া এবং মেশিনে শান দেয়ার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা।

যশোর শহরের খয়েরতলা এলাকার কামার বিশ্বজিৎ জানান, সারা বছর তেমন কাজ না থাকলেও কোরবানির ঈদ তাদের জন্য মূল মৌসুম। এই সময়ের আয় দিয়েই সারা বছর সংসার চালাতে হয় তাদের। তিনি বলেন, এখন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজ চলছে। অর্ডারের চাপ অনেক বেশি।

নিউজের ভিডিও দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন।

চৌগাছা উপজেলার গোবিন্দ কর্মকার জানান, ঈদ মৌসুমে শুধু নতুন দা-বঁটি নয়, পুরনো জিনিস শান দেয়ার চাপও অনেক বেড়ে যায়। প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টির বেশি অর্ডার আসছে। তবে এবার কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ কমে গেছে। এতে বিপাকে পড়তে হচ্ছে তাদের।

অভয়নগর উপজেলার দেবাশিষ কর্মকার জানান, আগে হাতে হাপর টেনে বাতাস দিতে হতো, এখন মোটরের সাহায্যে কাজ সহজ হয়েছে। তবে লোহা, কয়লা, বিদ্যুৎ ও শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় এখন উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি। তিনি জানান, আগে যে কয়লা প্রতি মণ ১২শ’ থেকে ১৪শ’ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা ১৮শ’ থেকে ২২শ’ টাকায় কিনতে হচ্ছে। একইভাবে স্প্রিং লোহা কেজি প্রতি ৯০ থেকে ১১০ টাকায় থেকে বেড়ে ১৪০ থেকে ১৮০ টাকায় পৌঁছেছে।

তিনি আরও জানান, তৈরি দা, বঁটি, চাপাতি ও ছুরি সারণ মান অনুযায়ী কেজি প্রতি ৩শ’ থেকে ৬শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের পণ্য বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকায়। তবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় লাভের পরিমাণ খুবই কম।

এদিকে ক্রেতারাও জানাচ্ছেন ভিন্ন অভিজ্ঞতা। কেউ বলছেন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ঠিক করতেই আসছেন, আবার কেউ দাম বেশি হওয়ায় আসন্তোষ প্রকাশ করছেন।

শহরতলীর চৌগাছা উপজেলার বাসিন্দা রায়হান নামে এক ক্রেতা জানান, পুরোন আর দা ও চাপাতি শান দিতে এনেছেন, কিন্তু এবার দাম তুলনামূলক বেশি চাওয়া হচ্ছে।

যশোরের বিভিন্ন বাজারে মাঝারি আকারের দা বিক্রি হচ্ছে ৫শ’ থেকে ৮শ’ টাকায়, বড় চাপাতি ৮শ’ থেকে হাজার ৫০ টাকা, বঁটি ৪শ’ থেকে ৭শ’ টাকা এবং ছুরি ৩শ’ থেকে ৬শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া বড় মাংস কাটার ছুরি ৭শ’ থেকে এক হাজার টাকা, এবং হাড় কাটার কুড়াল ১২শ’ থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোট চামড়া ছাড়ানোর ছুরি বিক্রি হচ্ছে ২শ’ থেকে সাড়ে তিনশ’ টাকায়।

অন্যদিকে পুরনো দা বা ছুরিতে শান দিতে নেয়া হচ্ছে ৫০ থেকে ২শ’ টাকা পর্যন্ত এবং বড় চাপাতি বা কুড়াল মেরামত বা ধার দিতে খরচ পড়ছে ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকা পর্যন্ত।

শহরের উপশহর এলাকার এলাকার বাসিন্দা বাবু বলেন, কোরবানির সময় ধারালো সরঞ্জাম ছাড়া কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ঈদের আগেই সব প্রস্তুত করে নিচ্ছেন তিনি।

একই এলাকার মিলন হোসেন জানান, ঈদের সময় মাংস কাটার জন্য দা, বঁটি ও ছুরি ধারালো থাকা জরুরি, তাই আগেই শান করিয়ে নিচ্ছেন।

একই এলাকার মিলোন হোসেন জানান, ঈদের সময় মাংস কাটার জন্য দা, বঁটি ও ছুরি ধারালো থাকা জরুরি, তাই সময় থাকতেই ধার করে নিচ্ছেন।

এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কামারশিল্প একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা হলেও আধুনিক যন্তপাতির অভাব, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং বাজার প্রতিযোগিতার কারণে এই শিল্প ব্যবহার সংকটে পড়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, সরকারি সহযোগিতার মাধ্যমে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নেয়া হবে।

কামারশিল্পের কারিগররা বলছেন, এই কাজে প্রচণ্ড পরিশ্রম। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। ফলে নতুন প্রজন্মের তরুণরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। সরকারি সহায়তা না পেলে ভবিষ্যতে এই ঐতিহ্যবাহী পেশা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।

Share.
Exit mobile version