বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
১৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যশোরের রাজারহাট থেকে মণিরামপুর ও কেশবপুর হয়ে খুলনার চুকনগর পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক তিন বছরও টেকেনি। নির্মাণ ও সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কটির বিভিন্ন অংশে পিচ ও পাথর উঠে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দ। কোথাও কোথাও দেবে গেছে সড়কের পিচঢালাই, ভেঙে গেছে কংক্রিটের অংশও। এতে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন। বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা, ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রী ও চালকেরা।
চালক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রি ব্যবহার ও কাজে অনিয়মের কারণেই অল্প সময়ে সড়কটির এমন বেহাল দশা হয়েছে। তবে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর বলছে, মোংলা ও ভোমরা স্থলবন্দরগামী অতিরিক্ত ভারি যানবাহন এবং দশ চাকার ট্রাক চলাচলের কারণে সড়কটি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি সংস্কারকাজের দরপত্র প্রক্রিয়া চলছে। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে মেরামত কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
যশোরের রাজারহাট থেকে মণিরামপুর ও কেশবপুর হয়ে চুকনগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই মহাসড়ক দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যশোরসহ আশপাশের এলাকার মানুষের পাশাপাশি মোংলা ও ভোমরা স্থলবন্দরগামী পণ্যবাহী যানবাহনও এ সড়ক ব্যবহার করে। দীর্ঘদিন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় ২০২০ সালে সড়কটি পুনর্র্নিমাণ ও প্রশস্তকরণের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয়ে উন্নয়ন কাজ শেষ হওয়ার তিন বছরের মধ্যেই সড়কটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ায় প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যশোর সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাজারহাট-মণিরামপুর-কেশবপুর-চুকনগর আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০২০ সালের ২০ জুলাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। প্রকল্পের বরাদ্দ ছিল ১৬৬ কোটি টাকা। বিভিন্ন প্যাকেজে যৌথভাবে কাজটি বাস্তবায়ন করে মোজাহার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড ও ইনফ্রাটেক কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড। নানা জটিলতায় কয়েক দফা সময় বাড়ানোর পর ২০২৩ সালের শেষ দিকে সড়কটির নির্মাণ ও মূল সংস্কার কাজ শেষ হয়।
কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার তিন বছর পার হওয়ার আগেই সড়কটির বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে ভাঙন। সরেজমিনে দেখা গেছে, যশোর সদর উপজেলার রাজারহাট, মণিরামপুর পৌর শহর, কেশবপুর বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে পিচ ও পাথর উঠে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও সড়কের ওপরের স্তর দেবে গেছে, কোথাও আবার পিচঢালাই ভেঙে উঁচু-নিচু হয়ে পড়েছে। মণিরামপুর ও কেশবপুর পৌর এলাকার কিছু অংশে কংক্রিটের ঢালাইও ভেঙে গেছে। এতে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সওজের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে জোড়াতালি দিয়ে মেরামতের চেষ্টা করা হলেও তা বেশিদিন টিকছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এই সড়কে চলাচলকারী বাস ও ট্রাকচালকদের অভিযোগ, খানাখন্দ এড়িয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে। হঠাৎ গর্ত সামনে পড়লে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ নেয়ার সুযোগ থাকে না। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কার পাশাপাশি গাড়ির স্প্রিং, পাতি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
যশোর-সাতক্ষীরা ভায়া চুকনগর রুটে নিয়মিত চলাচলকারী বাসচালক ইদ্রিস আলী বলেন, রাজারহাট থেকে চুকনগর পর্যন্ত এখন গাড়ি চালানো মানে জান হাতে নিয়ে চলা। রাস্তায় এত বড় বড় গর্ত হয়েছে যে, অনেক সময় ব্রেক করারও সুযোগ পাওয়া যায় না। প্রতিনিয়ত গাড়ির স্প্রিং-পাতি ভাঙছে, অন্য যন্ত্রাংশেরও ক্ষতি হচ্ছে। এখনই গর্তগুলো মেরামত করা না হলে ভবিষ্যতে গাড়ি চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে।
ভোমরা স্থলবন্দরগামী ট্রাকচালক রুবেল হোসেন বলেন, মোংলা ও ভোমরা বন্দরের মালামাল নিয়ে এ সড়কে চলাচল করা এখন দায় হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় পিচ গলে সড়ক দেবে গিয়ে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। চাকা গর্তে পড়লে গাড়ি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে যায়। দ্রুত মেরামত না করলে অল্প সময়ের মধ্যে সড়কের আরও বড় অংশ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
সড়কটির বেহাল দশা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, নির্মাণ ও সংস্কার কাজে অনিয়ম এবং নিম্নমানের সামগ্রি ব্যবহারের কারণে সড়কটি প্রত্যাশিত স্থায়িত্ব পায়নি। ফলে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও কয়েক বছরের মধ্যে আবার সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
মণিরামপুরের বাসিন্দা ইলিয়াস উদ্দীন অভিযোগ করে বলেন, তৎকালীন সরকারের মদদপুষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিম্নমানের কাজের কারণে সড়কটি দ্রুত ভেঙে পড়েছে। জামানতের টাকা ছাড় হওয়ার পরপরই রাস্তাজুড়ে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু জোড়াতালি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। টেকসই সংস্কারের পাশাপাশি কাজের মান যাচাই করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর যশোরের প্রধান প্রকৌশলী শাম্মী সুলতানা বলেন, অতিরিক্ত মালবাহী ভারি যানবাহন ও দশ চাকার ট্রাক চলাচলের কারণে মহাসড়কটি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্প্রতি ৩৮ কিলোমিটার সড়ক পরিদর্শন করা হয়েছে। সড়কটি যাতে পুরোপুরি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে না পড়ে, সে জন্য স্বল্পমেয়াদি জরুরি সংস্কার কাজের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মেরামত কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
