বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
শীত এলেই যশোরের গ্রামাঞ্চলে শুরু হয় খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির ব্যস্ততা। গাছিরা খেজুরগাছ প্রস্তুত করে রস সংগ্রহ করেন, সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করেন সুস্বাদু গুড় ও পাটালি। কয়েক মাসের এই মৌসুমি কর্মযজ্ঞ ঘিরে চাঙা হয়ে ওঠে গ্রামীণ অর্থনীতি। কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, দেশে খেজুরের গুড় উৎপাদনে শীর্ষে থাকা যশোরে গত পাঁচ বছরে গুড়ের উৎপাদন বেড়েছে ১০ শতাংশ। চার মাসের মৌসুমে রস ও গুড়ের বেচাকেনা হচ্ছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার। সম্প্রতি যশোরের খেজুর গুড় ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় এ ঐতিহ্যবাহী পণ্যের সম্ভাবনা আরও বেড়েছে।
খেজুরগাছ পরিচর্যা, রস সংগ্রহ, গুড় তৈরি, পরিবহন ও বিপণন—সব মিলিয়ে মৌসুমজুড়ে কর্মব্যস্ত থাকেন গাছি ও ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক বাণিজ্যেও বাড়ছে যশোরের খেজুর গুড় ও পাটালির চাহিদা। উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে এসব পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, এমনকি বিদেশেও। ফলে একদিকে বাড়ছে কৃষকের আয়, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
চৌগাছা উপজেলার যাত্রাপুর গ্রামের ওসমান আলী বলেন, আমি পাঁচ বিঘা জমিতে ধান, পাট ও সবজি চাষ করেছি। কিন্তু খরচ বাদ দিয়ে তেমন লাভ থাকে না। শীত এলে নিজের কিছু খেজুরগাছের পাশাপাশি এলাকার অন্যদের গাছও ভাগে নিই। পরিশ্রম করতে হয় ঠিকই, তবে রস ও গুড় বিক্রি করে ভালো আয় হয়।’
কৃষিকাজের সঙ্গে খেজুরগাছ থেকে আয়ের তুলনা করে তিনি বলেন, এক বিঘা জমিতে চার মাসে ২৫ থেকে ৩০ মণ ধান উৎপাদন হয়। সেই ধান বিক্রি করে ৩০ থেকে ৩৬ হাজার টাকা পাওয়া যায়। অথচ সেচ, সার, চারা, শ্রমিক ও ফসল কাটা-মাড়াইসহ খরচ হয় ২৫ হাজার টাকার বেশি। অন্যদিকে, শীতের চার মাস খেজুরগাছ পরিচর্যা করে রস ও গুড় বিক্রি থেকে ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘আগে খেজুরের গুড়ের দাম কম ছিল। গত পাঁচ বছর ধরে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। গত মৌসুমেও ৮০ হাজার টাকার গুড় বিক্রি করেছি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যশোরে খেজুরগাছ রয়েছে ২৩ লাখ ৩০ হাজার ৬৯৫টি। এর মধ্যে রস সংগ্রহের উপযোগী গাছ তিন লাখ সাত হাজার ১৩০টি। প্রতিটি গাছ থেকে বছরে গড়ে ২০ কেজি রস পাওয়া যায়। সেই রস থেকে তৈরি হয় প্রায় আট কেজি গুড়। সব মিলিয়ে জেলায় প্রতি মৌসুমে প্রায় ৯৫ লাখ কেজি বা সাড়ে ৯ হাজার মেট্রিক টন গুড় উৎপাদিত হয়। এর আনুমানিক বাজারমূল্য ১৫০ কোটি টাকা।
এ পেশার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সম্পৃক্ততা তুলনামূলক কম হলেও চৌগাছার বড় খানপুর গ্রামের রুবেল হোসেন ধরে রেখেছেন পারিবারিক ঐতিহ্য। বাবা ইউসুফ আলীর কাছ থেকে খেজুরগাছ কাটা ও রস সংগ্রহের কাজ শিখেছেন তিনি। গত পাঁচ বছর ধরে নিজেই গাছ কেটে রস সংগ্রহ এবং গুড়-পাটালি তৈরি করছেন।
রুবেল হোসেন বলেন, ‘আমার বাবা অন্তত ৫০ বছর খেজুরগাছ কেটেছেন। তার কাছ থেকেই কাজ শিখেছি। ভালো মানের গুড় তৈরি করতে পারলে এখন ভালো দাম পাওয়া যায়। আগে গুড় বিক্রি করতে হাটে যেতে হতো, এখন ক্রেতারা বাড়ি থেকেই কিনে নিয়ে যান। গত মৌসুমে ৬০ হাজার টাকার গুড় বিক্রি করেছি।’
যশোরের খেজুর গুড়ের বাজার এখন আর গ্রামীণ হাটে সীমাবদ্ধ নেই। শীত মৌসুমে গাছিদের কাছ থেকে গুড় কিনে পাইকাররা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করেন। পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক উদ্যোক্তারা ঘরে বসেই ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন গুড় ও পাটালি। এতে বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি গাছি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের আয়ের নতুন পথ তৈরি হচ্ছে। বছরের অন্য সময়েও খেজুরের গুড় পাওয়া গেলেও শীতের নতুন গুড়ের স্বাদ ও চাহিদা আলাদা।
যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘যশোরের খেজুর গুড় সুস্বাদু হওয়ায় এর চাহিদা বেশি। প্রতি মৌসুমে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার রস ও গুড় বিক্রি হয়, যা জেলার কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গত পাঁচ বছরে রস ও গুড়ের উৎপাদন ১০ শতাংশ বেড়েছে। নিরাপদ খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদনে কৃষকদের পরামর্শ, প্রশিক্ষণ এবং উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সচেতন করা হচ্ছে।’
