কাজী নূর
ঈদ মানেই আনন্দ, সামর্থ্য অনুযায়ী ত্যাগ আর পরিবারের সঙ্গে সুখের ভাগাভাগি। তবে সমাজের নিম্ন আয়ের বহু মানুষের কাছে কোরবানির ঈদ মানে নিজে কোরবানি দেয়া নয়, বরং কারও দেয়া সামান্য গোস্ত নিয়ে সন্তান-পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা। যশোর শহরে কর্মজীবী বিভিন্ন শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে এমনই বাস্তবতার গল্প।
সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি থানার পদ্মবেওলা গ্রামের হাফিজুল ইসলাম গত ২২ বছর ধরে যশোরে ছাদ ঢালাইয়ের কাজ করেন। জীবনের কঠিন বাস্তবতার কথা বলতে গিয়ে তিনি অশ্রুভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘ঢালাই কইরে খাই, আমাগে আবার কোরবানি! যে টাকা হাজিরা পাই তাই দিয়ে দুডো ভাত খাই। নামাজ পড়ে বউ বাচ্চা নিয়ে গিরামে চইলে যাবো। গিরামে যদি কেউ গোস্ত দেয় তালি পরিবার নিয়ে খাবো। এই হচ্ছে আমাগে ঈদ।’
চাঁদপুরের ফজলুর রহমান একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে যশোর পৌর এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ করেন। প্রতিদিন ময়লার ভ্যান টেনে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। তাই ময়লার মধ্য থেকে বিক্রয়যোগ্য পলিথিন, প্লাস্টিক, কাগজ কিংবা ধাতব জিনিস সংগ্রহ করে ভাঙারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন তিনি।
ফজলুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, যেসব বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করি, তাদের অনেকে দয়া করে একটু আধটু গোস্ত দেন। সেটিই আমাদের ঈদ আনন্দ। কেউ কেউ আবার আমাদের জন্য ফ্রিজে গোস্ত রেখে দেন।’
প্রায় বিশ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শ্রীকলস গ্রাম থেকে যশোর শহরে আসেন সালেহা বেগম। পরিচিতজনের মাধ্যমে গৃহশ্রমিকের কাজ নিয়ে শুরু হয় তার শহুরে জীবন। বর্তমানে দুই সন্তানের জননী সালেহা বেগম মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, আর ছেলে একটি পাদুকার দোকানে কাজ করেন।
নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা বলতে গিয়ে সালেহা বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। আমাগের আবার ঈদ আছে নাকি? ঈদে গোস্ত কুড়ায়ে বিলা থাকতি থাকতি ধাক করি গিরামে যায়ি সবাইরে নিয়ে গোস্ত খাবো। এই আমাগের ঈদ। কোরবানি দেবার সাধ্য কি আর আল্লা আমাগে দেছে!”
একই ধরনের কথা শোনালেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামের আবু হানিফ। প্রায় ৪২ বছর ধরে যশোর শহরে রিকশা চালিয়ে সংসার চালান তিনি। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কোরবানি তার ওপর ফরজ হয়নি বলেই মনে করেন তিনি।
আবু হানিফ বলেন, ‘ঈদ যশোরেই করবো। কেউ যদি গোস্ত দেয় সেটি পরিবারের সাথে নিয়ে রান্না করে ভাগাভাগি করে খাবো। গোস্ত না পেলে সাধ্য অনুযায়ী গোস্ত কেনার চেষ্টা করবো।’
সাতক্ষীরার ভুট্টা খান যশোর শহরে ছাদ ঢালাইয়ের শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তবে কোরবানির সময় বাড়তি একটি সুযোগ তৈরি হয় তার মতো দিনমজুরদের জন্য। তিনি বলেন, ‘কসাইদের রেট এ সময় অনেক বেড়ে যায়। তখন অনেকে আমার মতো শ্রমিকদের ডেকে গরু-ছাগল বানানোর কাজ দেয়। তারা যা গোস্ত দেয়, তাই দিয়েই চলে আমাদের ঈদ।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহারাজপুর গ্রামের শেখ নজরুল ইসলাম যশোরে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। রাজশাহীর এক ঠিকাদার ১৮ জন শ্রমিককে নিয়ে এসেছেন এখানে। ঈদ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই বাড়িতে ঈদ কইরবো। কন্ট্রাক্টর বুলেছে চাঁদরাতে পাওনা পরিশোধ করে দিবে। পাওনা পেইলে ছাগল কোরবানি কইরবো।’
অন্যদিকে, বয়স মাত্র পনেরো। নাম পুকাট উল্লাহ খান জাহিদ। যশোর শহরের হাজী মোহাম্মদ মহসিন রোডের একটি জুতার দোকানে কাজ করেন তিনি। ঈদের দিন দোকান মালিকের বাড়িতে কোরবানির কাজে সহযোগিতা করেন। বিনিময়ে মালিক যে সামান্য গোস্ত দেন, সেটুকুই নিয়ে বাড়ি ফেরেন ছোট্ট জাহিদ। তা দিয়েই মেটান পরিবারের ঈদ চাহিদা।
এদিকে রুপালী বেগম নামে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক স্বামী পরিত্যক্তা নারী শহরের হাসপাতাল মোড়ের একটি খাবার হোটেলে সবজি কাটার কাজ করেন। কোরবানির ঈদে তার পরিকল্পনা একটাই-সারাদিন বিভিন্ন বাড়ি থেকে মাংস সংগ্রহ করা। তারপর সন্ধ্যায় সেই গোস্ত নিয়ে মাগুরার শালিখায় বাবার বাড়িতে ফিরে যাওয়া।
এভাবেই সমাজের বিত্তবানদের কোরবানির উৎসবের আড়ালে এমন অসংখ্য মানুষের ঈদ লুকিয়ে থাকে সামান্য প্রাপ্তির অপেক্ষায়। কারও দেয়া এক টুকরো গোস্ত, একটু সহানুভূতি কিংবা পরিবারের মুখে একবেলা ভালো খাবার তুলে দিতে পারাটাই তাদের কাছে ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
