বাংলার ভোর প্রতিবেদক
কৈশোরে মায়ের প্রশ্রয়ে অসুস্থ বয়স্ক অপরিচিত নারীকে বাড়িতে এনে গোসল করিয়ে খাইয়ে, ডাক্তার দেখিয়ে আশ্রয় দেয়ার মধ্য দিয়ে যে মানবকল্যাণের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করা সেই পথিকের যাত্রা পথের চিরসমাপ্তি ঘটেছে। হাজারো মানুষকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নিয়েছেন জাগরণী চক্র ফাউণ্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক স্বপ্ন পথিক আজাদুল কবির আরজু।
যশোর শহর থেকে বেশ খানিকা দূরে এনায়েতপুর প্রীর বাড়িতে পিতা এ কে এম আমজাদ আলী ও মা আনোয়ারা বেগমের ঘরে জন্ম নেয়া ক্ষণজন্মা শনিবার বেলা ১ টা ৫ মিনিটে ৭২ বছর বয়সে পশ্চিম বারান্দীপাড়ার নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্নালিল্লাহে…রাজেউন)।
তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর খবরে জেসিএফ পরিবার, সুবিধাভোগী, স্থানীয় ও জাতীয় উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে এক শোকাবহ আবহের সৃষ্টি হয়। কান্নায় ভেঙে পড়েন সহকর্মী, স্বাজন ও শুভাকাক্সিক্ষরা। তাঁর মৃত্যুর খবরে মুজিব সড়কস্থ জেসিএফ প্রধান কার্যালয়ে ভিড় করেন যশোরের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সহ নানা শ্রেনি-পেশার মানুষ।
বাদ আসর যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহে আজাদুল কবির আরজুর প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে যশোরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর মধ্যে ছিল- জেসিএফ সাধারণ পরিষদ ও নির্বাহী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, জেসিএফ পরিবার, উদীচী, কিংশুক, বাংলার ভোর, স্পন্দন, চাঁদেরহাট, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, মাওলানা ভাষানী পরিষদ, সিপিবি যশোর শাখা, বির্বতন, যমুনা ব্যাংক, জয়তী সোসাইটি, টিএমএসএস, জাসদ, থিয়েটার ক্যানভাস, চারুপীঠ, তীর্যক, আরআরএফ, সুরধুনি, প্রাচ্য একাডেমি যশোর, ওয়ার্কার্স পার্টি, দৈনিক গ্রামের কাগজ।
পরে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আজাদুল কবির আরজুর মরদেহ রাখা হয় তাঁর আমৃত্যু কর্মস্থল জাগরণী চক্র ফাউণ্ডেশনের প্রধান কার্যালয়ে। পরে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর জন্মস্থান যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর ইউনিয়নের এনায়েতপুর গ্রামে। সেখানে বাদ এশা দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে রাতে তাঁর মরদেহ রাখা হয় যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের হিমঘরে।
সকাল সাড়ে ৯টায় মুজিব সড়কস্থ জেসিএফ প্রধান কার্যালয়ে প্রয়াত আজাদুল কবির তৃতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে সকাল সাড়ে ৮টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। পরে প্রয়াত আজাদুল কবির আরজুর ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর মরদেহ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের শিক্ষার কাজে ব্যবহারের জন্য যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দান করা হবে।
মরহুম আরজুর ভাই সাংস্কৃতিক কর্মী হারুণ অর রশিদ জানান, আরজুর মেজো বোন কানাডা থেকে যশোরে আসায় জাগরণী চক্র কার্যালয়ে একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠান চলাকালে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন।
দ্রুত তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক সাকিরুল ইসলাম তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকের মতে, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। তিনি বলেন, এক দশক আগে আরজু পরিবারের মতামত নিয়েই মরণোত্তর দেহদানের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
সেই কারণেই দ্রুতই তারা জানাজা শেষ করা হয়।’
এদিকে, আরজুর আকস্মিক মৃত্যুতে যশোরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যশোর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘আরজু ছিলেন যুক্তিবাদী ও অন্তর্মুখী মানুষ। নিজেকে সবমসময় গুটিয়ে রেখেছেন।
তার মৃত্যু ও মৃত্যুর পরে তার দেহদানের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন; তিনি যে নির্মোহ নির্লোভ মানুষের পাশাপাশি মানবতার সেবায় যে তার মূল লক্ষ্য ছিলো। তার হাতে গড়া কোন সম্পদই নিজে বা তার পরিবারের জন্য রেখে যাননি। সবকিছু ফাউণ্ডেশনে দিয়ে গেছেন। মানবতার কল্যাণে সবকিছুই যে উৎসর্গ করে যাওয়ার অন্যান্য উদাহরণ আজাদুল কবির আরজু।’
এছাড়া আজাদুল কবির আরজুর মৃত্যুতে ৭দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন। এর অংশ হিসেবে আজ জেসিএফ’র সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
এছাড়া শোকসভা, মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া মাহফিলসহ নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।
