সুনীল কুমার দাস
“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর” বেগম রোকেয়ার এই চিরচেনা পঙ্ক্তি যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে যশোরের অভয়নগরের এক নারীর জীবনসংগ্রামে।

‘শ্রেষ্ঠ জয়িতা’ নির্বাচিত হওয়া এই নারী আজ আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী দিবস ও রোকেয়া দিবসের মাহেন্দ্রক্ষণে নিজের জীবনের বেদনাময় পথচলার গল্প শোনালেন উপস্থিত অতিথি, সাংবাদিক এবং সুধীজনকে।

সংগীতে অনার্স-মাস্টার্স করা এই তরুণীর স্বপ্ন ছিল-একদিন বড় সরকারি চাকরি করবেন, নিজের ক্যারিয়ারকে দাঁড় করাবেন, তারপর জীবনসঙ্গী বেছে নেবেন।

কিন্তু বাস্তবের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। বিয়ের পরপরই তার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার, নির্যাতন আর দমিয়ে রাখার নিষ্ঠুর দুর্বৃত্ততা।

স্বামীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি ছিল-তিনি গান করবেন, বিসিএস দেবেন, নিজের প্রতিভাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। কিন্তু সংসারে পা রাখতেই শুরু হয় প্রতিশ্রুতিভঙ্গ।

তাকে বিসিএস পরীক্ষায় যেতে দেয়া হলো না, খুলনা বেতারে গান গাইতেও নিষেধাজ্ঞা।

একসময় নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে শুরু হলো শারীরিক নির্যাতন। মারধর থেকে শুরু করে ভিডিও কলে তার বাবা-মার সামনে অপমান-সবকিছু সহ্য করতে হয়েছে তাকে।

নির্যাতন চরমে পৌঁছায় একদিন-গামছা দিয়ে শ্বাসরোধের চেষ্টায়। ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় প্রাণে বাঁচলেও থামেনি অত্যাচার।

দিনের পর দিন মারধর করে একসময় তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় এক উকিলের কাছে, যেখানে জোরপূর্বক বিচ্ছেদের কাগজে করানো হয় সই।

বাবার বাড়িতে ফিরে তিনি নতুনভাবে জীবন শুরুর দৃঢ় সিদ্ধান্তে আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন বেগম রোকেয়ার শক্তিকেই-মহান শিক্ষাপ্রদর্শিকার আদর্শ যেন তাকে বলেছিল, “তুমি পারবে, সামনে এগিয়ে যাও।”

এরপর শুরু হয় তার পুনর্জাগরণ। নতুন করে পড়াশোনা, পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস আর নিত্য সংগ্রাম।

নড়াইল কালেক্টরেট স্কুলে শিক্ষকতা, পরে ব্র্যাকে, আবার চাকরি বয়সসীমা বাড়ার খবর পেয়ে ব্র্যাক থেকে বের হয়ে সরকারি চাকরির জন্য নিরবচ্ছিন্ন প্রস্তুতি-সবকিছু মিলিয়ে তার জীবন যেন সংগ্রামের মহাকাব্য।

এখন তিনি ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধনের ভাইভা উত্তীর্ণ, মুক্তেশ্বরী সংগীত নিকেতনে এবং কিশোর-কিশোরী ক্লাবে গান শেখান-পাশাপাশি খুলনা বেতারের নিয়মিত শিল্পী। আরও ভালো চাকরির স্বপ্নে তিনি নিরন্তর সাধনায় লিপ্ত।

আজ ‘জয়িতা’ সম্মাননা পাওয়ার মুহূর্তে তিনি আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, “জয়িতার খাতায় আমার নাম উঠেছে বলে আমি ধন্য।

আপনাদের আশীর্বাদ, পরিবার ও সমাজের সকল শুভবোধ আমাকে আজকের জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। আমি অপেক্ষায় আছি এক সোনালি দিনের।”

তার এই সাহস, পুনর্গঠন এবং পুনর্জন্মের গল্প শুধু একজন নারীর নয়-এটি আমাদের সমাজের সমস্ত নারীর সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।

Share.
Exit mobile version