ঝিনাইদহ সংবাদদাতা
ঝিনাইদহে ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীদের পিটুনিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নীরব আহমেদ (২২) নিহত হওয়ার ঘটনায় শনিবার রাতে দুটি ফিলিং স্টেশনে ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ সময় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে রাখা তিনটি বাসেও আগুন দেয়া হয়।
এর প্রতিবাদে রোববার সকাল থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত ঝিনাইদহ-ঢাকা মহাসড়কের ঝিনাইদহ বাস টার্মিনাল এলাকা অবরোধ করে রাখেন বাসশ্রমিকেরা। পরে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেন তারা।
অপরদিকে, শনিবার রাতে নিহতের বাবা ইউনুস আলী বাদী হয়ে চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতদের আসামি করে সদর থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় পুলিশ তিনজনকে আটক করেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, বাসে আগুন দেয়ার প্রতিবাদে রোববার সকাল থেকে ঢাকা-ফরিদপুরগামী মহাসড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেন বাসশ্রমিকেরা। তারা রাতে পুড়ে যাওয়া বাস সড়কে আড়াআড়ি করে রেখে অবরোধ করেন। এতে এই রুটের সব ধরনের যানবাহনের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।
এর আগে শনিবার রাত নয়টার দিকে ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় অবস্থিত তাজ ফিলিং স্টেশনে তেল না দেয়ার অভিযোগে কর্মচারীদের পিটুনিতে নীরব আহমেদের মৃত্যু হয়। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঝিনাইদহ জেলার সাবেক আহ্বায়ক কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য।
স্থানীয় সূত্র জানায়, রাতে নিরব তার দুজন বন্ধুসহ মোটরসাইকেলে তেল নিতে যান। কিন্তু ফিলিং স্টেশনের বিক্রয়কর্মীরা তাকে তেল দেননি। তবে কিছুক্ষণ পরেই স্টেশনের কর্মীরা বোতলে তেল ভরছিলেন। সেটা দেখে তিনি জানতে চান কেন বোতলে তেল ভরা হচ্ছে, আর তাকে কেন তেল দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে ফিলিং স্টেশনের বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে বিক্রয়কর্মীরা তাঁকে বাঁশের লাঠি নিয়ে মারধর শুরু করেন। পরে বন্ধুরা তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঝিনাইদহ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান।
এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা রাতেই তাজ ফিলিং স্টেশনের মালিকের শহরের আরাপপুর এলাকার আরেকটি ফিলিং স্টেশনে ভাঙচুর চালান। এ সময় তিনটি বাসে আগুন দেয়া হয়।
জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি রোকনুজ্জামান রানু বলেন, ‘টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি কোচে গভীর রাতে আগুন দিয়েছে ১৫ থেকে ২০ জন দুর্বৃত্ত। তারা কারা? তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। আমাদের নিরাপত্তা দিতে হবে। না হলে আমরা সড়কে গাড়ি কীভাবে চালাব? অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আমাদের আশ্বস্ত করেছেন এই ঘটনায় মামলা নিয়ে জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হবে। টার্মিনাল এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হবে। সেই আশ্বাসে বেলা ১১টার দিকে শ্রমিকেরা অবরোধ তুলে নিয়েছেন।’
এদিকে, মারপিটের ঘটনায় আটক তিনজনকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
গ্রেপ্তাররা হলেন সদর উপজেলার বারইখালী গ্রামের নাসির উদ্দিন, আড়ুয়াকান্দি গ্রামের রবিজুল ইসলাম ও কাস্টসাগরা গ্রামের দাউদ হোসেন।
ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সামসুল আরেফীন জানান, যুবক নিহত হওয়ার পর শনিবার রাতেই নিহতের বাবা আলিমুর বিশ্বাস বাদী হয়ে চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতদের আসামি করে সদর থানায় মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় আটক তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন, আরাপপুরে সৃজনী ফিলিং স্টেশনে ভাঙচুরের ঘটনাটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতা নিহত হওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে পার্ক করা বাসে আগুনের ঘটনাটিও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতা নিহত হওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। সব কটি ঘটনাতেই আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তাজ ফিলিং স্টেশনের মালিক হারুন অর রশিদ বলেন, তিনি ঘটনার সময় ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। রাতে যুবককে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরে তাকে এই ঘটনার বিষয়ে জানানো হয়। এ ঘটনায় তার কোনো সম্পৃক্ততা না থাকলেও তাঁর মালিকানাধীন সৃজনী ফিলিং স্টেশন ও জেআর পরিবহনের একটি বাসসহ অন্য মালিকদের আরও দুটি বাস পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
নিহত নীরবের সৎ বাবা হারুন অর রশীদ গণমাধ্যমকে বলেন, ছেলেটি তাঁর কাছেই বড় হয়েছে। পরে ঝিনাইদহ শহরে খালার বাড়িতে চলে আসে। এখানে থেকে পড়ালেখা করতো। শনিবার রাতে তাঁরা মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে আসেন। এখন ময়নাতদন্তের জন্য অপেক্ষায় আছেন। মৃতদেহ ঝিনাইদহ সরকারি কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে তিনি জানান।

