বাংলার বানিজ্য
দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। সবজি, মুরগি, ভোজ্যতেল, চিনি—প্রায় সব প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন বাধ্য হয়ে পছন্দের পণ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে তুলনামূলক কম দামের পণ্য কিনছেন। অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম কিনে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি তেলের সংকট ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে, সম্ভাব্য সংকট ও দাম আরও বাড়ার আশঙ্কায় কিছু ক্রেতা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পণ্য কিনে মজুত করছেন। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলেছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দেশের বাজারেও। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে। তারা মনে করেন, শুধু অভিযান চালিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; বরং আমদানিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো, বাজারে মজুত পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা এবং দেশীয় উৎপাদনে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো জরুরি।
এদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার দাবি করলেও বাস্তব বাজার পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ৮.৭১ শতাংশে নামলেও বাজারে পণ্যের দাম কমেনি; বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেড়েছে। বিশেষ করে গত ৬ মার্চ জ্বালানি তেলের রেশনিং চালুর ঘোষণার পর থেকেই বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে।
ভোজ্যতেল ও চিনির বাজারে ঊর্ধ্বগতি
ঈদুল ফিতরের আগেই ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা এবং পাম অয়েল ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে চিনির বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঈদের আগে যেখানে প্রতি কেজি চিনি ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা বেড়ে ১০০ থেকে ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আমিষ পণ্যে চাপ
মুরগির বাজারে অস্থিরতা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে। সোনালি মুরগির দাম মাসখানেকের ব্যবধানে কেজিপ্রতি প্রায় ১৩০ টাকা বেড়ে ৪০০ থেকে ৪৩০ টাকায় পৌঁছেছে। ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির দামও বাড়তি। এর প্রভাব পড়েছে গরুর মাংসের বাজারেও, যেখানে কেজিপ্রতি দাম এখন ৮০০ টাকায় উঠেছে।
সবজির বাজারে অস্বস্তি
স্বল্প সময়ের ব্যবধানে সবজির দামও বেড়েছে। চিচিঙ্গা, ঝিঙে ও ধুন্দলের মতো গ্রীষ্মকালীন সবজির দাম কেজিপ্রতি ১০০ টাকার ওপরে উঠে গেছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় ফসলের ক্ষতি হওয়ায় সরবরাহ কমেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিও বড় ভূমিকা রাখছে।
এলপিজির দামেও অস্বাভাবিকতা
রান্নার গ্যাসের বাজারেও অস্থিরতা দেখা গেছে। ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সরকারিভাবে ১,৭২৮ টাকা নির্ধারণ করা হলেও খুচরা বাজারে তা ২,০০০ থেকে ২,২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সমাধানের পথ কোথায়
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর তদারকির পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে বাজারে পণ্যের মজুত পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য দিয়ে জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনাও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি সংস্থাগুলো বলছে, বাজার তদারকি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবে এত বড় বাজার ব্যবস্থাপনা এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলেও তারা স্বীকার করছে।

